দুই ইসরাইলি সেনা নিহত: পশ্চিম তীরে বড় সামরিক অভিযানের ঘোষণা নেতানিয়াহুর

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • ২০২৬-১০-২৪ ১১:০২:০৬
image

অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনে বন্দুক হামলায় দুই ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার পর সেখানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। শুক্রবারের এ হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই ইসরাইলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকায় ঘটনাটি দেশটির নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর তথ্যমতে, হেবরনের কাছে জুডিয়া জংশন এলাকায় বন্দুক হামলায় দুই সেনা নিহত এবং আরও তিনজন আহত হয়েছেন। পাল্টা গুলিতে দুই সন্দেহভাজন ফিলিস্তিনি হামলাকারীও নিহত হন। নিহত দুই ইসরাইলি সেনা হলেন স্টাফ সার্জেন্ট রন ইয়োনাতান রয়টম্যান, ২৩, এবং সার্জেন্ট ইউভাল শাই স্ভিলেম,২০।
ঘটনার পর নেতানিয়াহু হেবরনসহ পশ্চিম তীরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে হেবরন সফরে গিয়ে তিনি বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজের সঙ্গে তিনি পশ্চিম তীরে এমন একটি ব্যাপক সামরিক অভিযান নিয়ে কাজ করছেন, যার মাত্রা ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর দেখা যায়নি। 
নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা অনুযায়ী, অভিযানের প্রাথমিক পর্যায়ে হামলাকারীদের বসতিতে ইসরাইলি বাহিনী প্রবেশ করবে, বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়া হবে, বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি চালানো হবে এবং ইসরাইলের ভাষায় ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ ধ্বংস করা হবে। তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযান চালানোর জন্য ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে এবং কখন অভিযান শুরু হবে, সে সময় নির্ধারণ করা হবে। 
ইসরাইলি সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে হেবরন এলাকায় ‘সন্ত্রাসবিরোধী আক্রমণাত্মক অভিযান’ শুরু করার কথা জানিয়েছে। সন্দেহভাজন হামলাকারীদের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। 
হামলার বর্ণনা
এএফপির এক আলোকচিত্রী ঘটনাস্থলের কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন। তার প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনা অনুযায়ী, ফারশ আল-হাওয়া চেকপোস্ট এলাকায় দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর সঙ্গে ইসরাইলি সেনাদের গোলাগুলি হয়। হামলাকারীদের একজনের কাছে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল এবং অন্যজনের কাছে পিস্তল ছিল। প্রায় ২০ মিনিটের গুলিবিনিময়ের পর ইসরাইলি বাহিনী দুই হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, হামলাকারীরা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আরও বড় হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল। নেতানিয়াহুও বলেছেন, সেনারা সম্ভাব্য বড় ধরনের হামলা ঠেকিয়েছে। তবে হামলার উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য পরিকল্পনা সম্পর্কে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের দাবিগুলো তাদের নিজস্ব বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা ইস্যু
আগামী মঙ্গলবার ইসরাইলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনী প্রচারে নিরাপত্তা ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। নেতানিয়াহু আবারও ক্ষমতায় থাকার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং তার প্রচারে ইসরাইলিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি অন্যতম প্রধান বিষয়।
শুক্রবারের হামলার পর নেতানিয়াহুর দল দিনের বাকি সময়ের নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম বাতিল করে। ফলে হামলাটি নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে ইসরাইলের রাজনৈতিক আলোচনায় নিরাপত্তাকে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামরিক পদক্ষেপ এবং নির্বাচনী রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য থাকলেও, হামলাটি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছিল-এমন দাবি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী করেছেন; এর স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
স্মোটরিচের কঠোর অবস্থান
ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ, যিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও দায়িত্ব পালন করছেন, পশ্চিম তীরে গাজার মতো বড় সামরিক অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
হামলার পর তিনি হেবরন এলাকায় ভবন ও স্থাপনা ভাঙার কাজ শুরু হওয়ার কথা জানান। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার স্থানসংলগ্ন এলাকায় ইসরাইলি বুলডোজার দিয়ে ভবন ভাঙার কাজ শুরু হতে দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অবশ্য দাবি করেছেন, এসব ভবনের সঙ্গে হামলাকারীদের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বিলুপ্তির দাবি
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির পশ্চিম তীরে সীমিত স্বায়ত্তশাসন পরিচালনাকারী ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
তবে শুক্রবারের হামলার সঙ্গে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক সদর দপ্তর রামাল্লায়।
বেন-গাভির ও স্মোটরিচ-দুজনই পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের সমর্থক। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিগুলোকে অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়-এমন অবস্থান জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে।
হামাসের প্রতিক্রিয়া
ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস শুক্রবারের হামলার দায় সরাসরি স্বীকার করেনি। তবে তারা ঘটনাটিকে ‘বীরত্বপূর্ণ অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং আরও হামলার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি হামলাকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান ইসরাইলি কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেছে। 
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে বড় ধরনের হামলার পর গাজায় যুদ্ধ শুরু হয়। সেই সংঘাতের প্রভাব পশ্চিম তীরেও ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানে ইসরাইলি বাহিনী, ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী ও ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
জাতিসংঘের উদ্বেগ
পশ্চিম তীরে নতুন করে ব্যাপক সামরিক অভিযান, অবরোধ ও চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনায় মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠন বিৎসেলেম আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘সমষ্টিগত শাস্তি’ এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে-এমন কর্মকাণ্ড ঠেকাতে আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োজন।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্রও পশ্চিম তীরে ইসরাইলের বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও অবরোধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এসব পদক্ষেপ ফিলিস্তিনিদের জীবিকা ও দৈনন্দিন জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সব পক্ষকে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সামনে কী হতে পারে
হেবরনের হামলার পর পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সামরিক তৎপরতা আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নেতানিয়াহু যে বড় আকারের অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন, তার বাস্তবায়ন হলে বাসিন্দাদের স্থানচ্যুতি, বাড়িঘরে তল্লাশি, গ্রেপ্তার এবং স্থাপনা ধ্বংসের মতো পদক্ষেপ আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে পাল্টা হামলার আহ্বান পশ্চিম তীরে পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। ফলে নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতি যেমন ইসরাইলের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তেমনি ফিলিস্তিনিদের জন্যও নতুন করে মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 
সূত্র: এএফপি, রয়টার্স, এপি**
  
পশ্চিম তীর সামরিক অভিযান, নেতানিয়াহু হেবরন, ইসরাইলি সেনা নিহত, West Bank military operation, Benjamin Netanyahu Hebron