রাণীনগরে নিয়োগ,পদোন্নতি ও সরকারি বেতন-ভাতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন; তদন্তের পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ
স্টাফ রিপোর্টার
নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার ঘোষগ্রাম কফিলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোজাহার হোসেনের বিরুদ্ধে নিয়োগবিধি লঙ্ঘন, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের আগেই এমপিওভুক্তি, পদোন্নতিতে অনিয়ম এবং সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে একাধিকবার তদন্ত হলেও প্রায় ২৯ বছর ধরে তাঁর চাকরির বৈধতা ও পদোন্নতি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের কার্যকর নিষ্পত্তি না হওয়ায় শিক্ষা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
অভিযোগসংশ্লিষ্ট কিছু নথিপত্র এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এসব নথিতে উল্লেখিত তারিখ ও তথ্যের মধ্যে অসংগতি রয়েছে বলে দাবি অভিযোগকারীদের। তাঁদের প্রশ্ন—নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জিত না হয়ে থাকলে কীভাবে তিনি চাকরিতে যোগদান, এমপিওভুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে উচ্চতর পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলেন? আর অভিযোগের তদন্ত হয়ে থাকলে সেগুলোর ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
সনদ ইস্যুর আগেই এমপিওভুক্তির অভিযোগ
প্রাপ্ত নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ১৪ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. ইরশাদুল হকের স্বাক্ষরিত একটি পরিপত্রে কৃষি ডিপ্লোমা কোর্সের চতুর্থ সেমিস্টারে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট শর্তে মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা দাখিল মাদ্রাসায় কৃষি শিক্ষকের শূন্য পদে সাময়িকভাবে শিক্ষকতা করার সুযোগের কথা উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে চূড়ান্ত ডিপ্লোমা অর্জনের পর বিধিমোতাবেক নিয়োগের বিষয়টিও বলা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু অভিযোগসংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে দেখা যায়, মো. মোজাহার হোসেনের কৃষি ডিপ্লোমা পাসের সাময়িক সনদ ইস্যু করা হয়েছে ২০০০ সালের ২ আগস্ট। অথচ নথি অনুযায়ী, ওই বছরের ১ এপ্রিল থেকেই তিনি এমপিওভুক্ত হন। অর্থাৎ সনদ ইস্যুর প্রায় চার মাস আগেই এমপিওভুক্তির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এই সময়গত অসংগতি কীভাবে তৈরি হলো, কোন নথির ভিত্তিতে এমপিও অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা যাচাই করেছিল কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিয়োগ থেকে প্রধান শিক্ষক-যোগ্যতা ও পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. মোজাহার হোসেন ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি কৃষি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান। কিন্তু এসব পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রযোজ্য বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর নিয়োগবিধি ও অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ হয়েছিল কি না, তা যাচাই না করে পদোন্নতি দেওয়া হয়ে থাকলে সেটি গুরুতর প্রশাসনিক অনিয়ম। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট সময়ের নিয়োগবিধি, নিয়োগপত্র, পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত, এমপিও অনুমোদন এবং পদোন্নতির নথি যাচাই করা জরুরি।
তদন্ত হয়েছে,কিন্তু দৃশ্যমান ব্যবস্থা কোথায়?
অভিযোগসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিকবার তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের একটি তদন্ত প্রতিবেদনেও বিভিন্ন অসংগতি উঠে এসেছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। কিন্তু সেসব অসংগতির ভিত্তিতে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরে ২০২৬ সালের ২১ মে তাঁকে পুনরায় যোগদানের সুযোগ দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। বরখাস্তের সিদ্ধান্ত, পরবর্তী আদেশ, পুনর্বহালের আইনি ভিত্তি এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা হলে বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
এখানেই উঠছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যদি অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হয়ে থাকে, তবে তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করে তা পরিষ্কার করা হচ্ছে না কেন? আর যদি তদন্তে বিধিবহির্ভূত নিয়োগ বা পদোন্নতির প্রমাণ পাওয়া গিয়ে থাকে, তাহলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও জনসমক্ষে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য
অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক মো. মোজাহার হোসেন বলেন, “অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। আমি নিয়ম মেনেই চাকরি করছি।”
তিনি তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদন সাংবাদিকদের দিতে চেয়েছিলেন বলে জানান সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক। তবে প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত দুই সপ্তাহ পার হলেও সেসব নথি পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদক জানিয়েছেন।
প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, এমপিওভুক্তি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের। তাই এ ঘটনায় শুধু অভিযোগ-অস্বীকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়োগের মূল নথি, ডিপ্লোমা সনদ, এমপিওভুক্তির আদেশ, পদোন্নতির কাগজপত্র, তদন্ত প্রতিবেদন এবং পুনরায় যোগদানের অনুমোদন যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
প্রায় তিন দশক ধরে চলা এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের সুস্পষ্ট বক্তব্য ও নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
এখন দেখার বিষয়, নথিতে উল্লিখিত অসংগতিগুলোর ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে দেয় এবং তদন্তের ভিত্তিতে আদৌ কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কি না।