সু ব র্ণা রা য়

  • শিরোনামহীন
  • ২০২৬-১০-০৯ ১৭:৫৯:৫০
image

আমাদের আবার দেখা হলো, বছর চারেক পরে। তখন আমরা দুজনেই বয়স বিয়াল্লিশের কোঠায়। চুলে পাক ধরেছে, চোখে পাওয়ার দেওয়া চশমা। আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত।
হঠাৎ একদিন ফোনে আমাদের কথা হয়েছিল। পুরোপুরি অচেনা না হলেও, অনেকটাই অচেনা। তারপর একদিন, দুদিন, এভাবে টানা তিন মাস কথা বলার পর আমাদের দেখা হলো।
দেখার পর থেকে অনিমেষকে আমার একটুও দূরের মানুষ মনে হয়নি। মনে হয়েছে, অনেক আপন, অনেক কাছের একজন মানুষ। হঠাৎ দেখা হওয়া একজন মানুষকে এতটা আপন মনে হতে পারে, তা জানা ছিল না। যদিও এর পুরো কৃতিত্বই অনিমেষের।
অনিমেষ তার পুরো জীবন আমার সাথে ভাগ করে নিয়েছিল। ওর প্রথম প্রেম, অনুভূতি, ভালো লাগা, মন্দ লাগা, সবকিছু। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম ওর গল্প গুলো।কিন্তু আমার জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে, আমার বলার মতো তেমন কিছুই থাকত না। আমি জ্ঞান-বুদ্ধিতে খুবই সাধারণ একজন মানুষ।
আর অনিমেষের কাছেই আমি শিখেছি, কীভাবে বইয়ের তাকের মতো জীবনের প্রতিটি অনুভূতিকে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখতে হয়, যত্ন করতে হয়। ওর কাছেই শিখেছি, স্বাধীনতা মানে শুধু চলাফেরা বা পোশাকের স্বাধীনতা নয়। স্বাধীনতা মানে কথা বলার স্বাধীনতা, কাজের স্বাধীনতা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রকাশের স্বাধীনতা।
অনিমেষের সাথে চলতে চলতে আমার জীবনের পুরোনো বইয়ের পাতা গুলো আবার খুলতে শুরু করেছিল। আমি আবার জীবনের মানে বুঝতে শিখছিলাম।
অনিমেষ আমার ভালো বন্ধু, না ভালোবাসার মানুষ, কোনোদিন বুঝতে পারিনি। অবশ্য বুঝতে পারিনি বললে ভুল হবে, বুঝতে চাইনি কখনো।কারণ বাস্তবতার শেকড় তখন অনেক গভীর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। আর মায়ার টানাপোড়েনে পরে ,অনিমেষকে নিয়ে ভাবনা গুলোও খুব বেশি দূর এগোয়নি।
তবুও অনিমেষ আমার জীবনের অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে।
অনিমেষ খুব গোছানো একজন মানুষ। তাই যখন আমাদের সম্পর্কটা নামহীন হয়ে গেল, তখন ও আর থাকতে চাইল না। আমিও কোনো যুক্তিতে ওকে বেঁধে রাখতে পারলাম না।
কিন্তু মনের ভেতরে যে ক্ষরণ  হলো, তার ব্যাখ্যাও দিতে পারলাম না। কারণ কোনো অজুহাতই সেখানে দাঁড়াতে পারল না।
একদিন অনিমেষ আমাকে কিছু না বলেই দেশের বাইরে চলে গেল। ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাস দেখে বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। অভিমানও হলো। চোখের জলে কষ্টের প্রগাঢ়তায় সেই নামহীন সম্পর্কটা যেন আরও গভীর হয়ে গেল।
সেই থেকে অনিমেষের সঙ্গে আমার এই নামহীন সম্পর্ক চলমান।
আজ হঠাৎ চার বছর পরে অনিমেষকে দেখে আমি থমকে গেলাম। সেই চেনা হাসি, সেই চেনা মানুষ। শুধু পরিবর্তনটা চোখে পড়ার মতো। হয়তো আমিও বদলে গেছি অনেকভাবে।
নয়তো বয়সের মাধুর্য আর দায়িত্বের বোঝাপোড়ায় আমাদের সম্পর্কটার আর কোনো নাম দেওয়া হয়নি। আজও হলো না।
জীবনে বিশেষ কিছু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এমনই হয়। তারা না চাইতেই অনেক কিছু দিয়ে যায়। কিন্তু সেই দেওয়ার কোনো নামকরণ করা সম্ভব হয় না।
অনিমেষ চলে যাচ্ছে। তপ্ত সূর্যটাও গোধূলির আলোয়  মিশে যাচ্ছে।
আর আমি গোধূলির লাল আভায় অনিমেষের মিশে যাওয়া দেখছি।