শ্রমিকের দারিদ্র্যের ওপর বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা দাঁড় করানো যাবে না

  • আমরিন হোসাইন এ্যানি
  • ২০২৬-১০-০৯ ১৪:০১:৩৯
image

আজ ০৯ অক্টোবর’ ২০২৬ইং রোজ শুক্রবার সকাল ১০:৩০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবিলম্বে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুণনির্ধারণের লক্ষ্যে মজুরি বোর্ড পুণঃগঠন এবং ন্যূনতম মজুরি ৩০,০০০ টাকা ঘোষণার দাবিতে গ্রীণ বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন (GBGWF) ও ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স ইউনিটি সেন্টার (NWUC)-এর যৌথ উদ্যোগে শ্রমিক সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে গ্রীণ বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশর ও ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স ইউনিটি সেন্টার এর সভাপতি মোসাঃ সুলতানা বেগম এর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইলিয়াস, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নারী কমিটির সভাপতি রোজিনা আক্তার সুমি, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ ফরিদ উদ্দীন, দপ্তর সম্পাদক ও নারী কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমরিন হোসাইন এ্যানি, সহ-সভাপতি সেলিনা হোসাইন, প্রচার সম্পাদক মোঃ তাহেরুল ইসলাম, কার্যকরি সদস্য অঞ্জলি, গাজীপুর কমিটির নারী বিষয়ক সম্পাদক মৌসুমী সরকার, আহমেদ ফ্যাশন শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ রুবেল, জাকিয়া সুলতানা, জোসনা বেগম, সালমা আক্তার, যমুনা ফ্যাশন ওয়্যার শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ফারুক হোসেন, প্রান্ত মিয়া, রাসেলসহ মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, টংগী ও গাজীপুরের বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকগন।
সংহতি বক্তব্য রাখেন নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসাইন।
সভাপতির বক্তব্যে সুলতানা বেগম বলেন ২০২৬ সালের ৯ম জাতীয় পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন ১০০% থেকে ১৪২% পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। ২০২৩ সালে নির্ধারিত বর্তমান ১২,৫০০ টাকা, ন্যূনতম মজুরি ইতোমধ্যেই খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপে প্রকৃত মূল্য হারিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি লাখ লাখ শ্রমিকের শ্রম ও ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও যাতায়াতসহ জীবনযাত্রার ব্যয় প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পেলেও শ্রমিকদের মজুরি সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি। ফলে বর্তমান মজুরিতে শ্রমিক ও পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের কথা বিবেচনা করছে। এই প্রক্রিয়া যেন আবারও দীর্ঘসূত্রতা, নামমাত্র পরামর্শ কিংবা মালিকপক্ষ ও সরকারের মধ্যে বন্ধ দরজার আলোচনায় পরিণত না হয়। 
বক্তারা বলেন ২০২৬ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইনের সংশোধনের ফলে ন্যূনতম মজুরি পুননির্ধারণের সময়সীমা তিন বছরে নামিয়ে আনা হয়েছে। সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে কোনো শিল্প দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। শ্রমিকের জীবনমান উন্নত করা, শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার স্বার্থেই একটি ন্যায়সংগত মজুরি কাঠামো জরুরি। শ্রমিকের মজুরি বাড়ালে শিল্প ধ্বংস হবে, এ ধরনের প্রচারণা বাস্তবতাবিবর্জিত। বরং ন্যায্য মজুরি শ্রমিকের জীবনমান, উৎপাদনশীলতা, কর্মস্থলে স্থায়িত্ব এবং শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
বক্তারা আরও বলেন বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা বাংলাদেশের পোশাক শিল্প থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। তাই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির দায় শুধু সরকারের নয়, মালিকপক্ষ ও আন্তর্জাতিক ক্রেতা-ব্র্যান্ডকেও দায়িত্ব নিতে হবে। মজুরি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় শ্রমিক ও প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা সরকার ও মালিকপক্ষকে সতর্ক করে বলতে চাই, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি শ্রমিকের অধিকার। শ্রমিকের কম মজুরি, অতিরিক্ত উৎপাদন টার্গেট, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকির খরচ শ্রমিকের ঘাম দিয়ে পরিশোধ করিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখা যাবে না। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরাই এই রপ্তানি শিল্পের সম্পদ ও সম্পদ-সৃষ্টিকারী শক্তি, তাদের সেই সম্পদের ন্যায্য অংশ দিতে হবে।
আজকের সমাবেশে বক্তারা আরও স্পষ্ট করেন  গার্মেন্টস শিল্প প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার কারণ শ্রমিক সস্তা নয়। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প প্রতিযোগিতামূলক কারণ লাখ লাখ শ্রমিক, যাদের অধিকাংশই নারী, অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে বিপুল মূল্য উৎপাদন করেন। শ্রমিক উৎপাদনের আরেকটি “খরচ” মাত্র নয়। শ্রমিকই মূল্য উৎপাদন করেন। দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প উৎপাদনের একটি বড় অংশের খরচ শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে এসেছে যেমন কম মজুরি, দীর্ঘ ও তীব্র কাজ, উৎপাদনের চাপ, অনিরাপদ চাকরি, অপর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা এবং অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশের মাধ্যমে। এখন জলবায়ু পরিবর্তন সেই বোঝার সঙ্গে আরেকটি স্তর যুক্ত করেছে। শ্রমিককে ক্রমবর্ধমান তাপের মধ্যে একই গতিতে উৎপাদন করতে বলা হচ্ছে। এভাবে চলতে পারে না। 

 আমাদের দাবি
১. অবিলম্বে ‍ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে।
২. ন্যূনতম মজুরি ৩০,০০০ টাকা করতে হবে।
৩. মোট মজুরির অন্তত ৬৫ শতাংশ মূল মজুরি করতে হবে।
৪. বছরে ন্যূনতম ১৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে।
৫. মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের প্রকৃত ও স্বাধীন প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
৬. আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের দায়িত্ব নিতে হবে।
৭. হিট স্ট্রেসকে পেশাগত স্বাস্থ্য ও শ্রমিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
৮. চাকরির নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার ও স্থায়ী ত্রিপক্ষীয় সংলাপ নিশ্চিত করতে হবে।
সমাবেশ শেষে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালী হাইকোর্ট মোড়, তোপখানা রোড, পল্টন মোড় প্রদক্ষিন করে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এসে সমাপ্ত হয়।