২১ বছরের অধ্যায় শেষে মেসির অশ্রুসিক্ত বিদায়

  • স্পোর্টস ডেস্ক
  • ২০২৬-১০-০৭ ১৫:২৯:১৪
image

বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে আবেগ, ভালোবাসা আর সম্মানের আবহে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবার মাঠে নামলেন লিওনেল মেসি। বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে ২১ বছরের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি টানলেন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা এই তারকা।
৮৫ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে ২০৮তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমে বিদায়ী রাতটিকেও স্মরণীয় করে রাখেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। নিজে একটি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থ নিকোলাস ওতামেন্দি ও নিকো পাজের গোলেও সরাসরি অবদান রাখেন তিনি। ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে করা গোলটি ছিল আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ১২৬তম আন্তর্জাতিক গোল।
তবে ম্যাচের জয়-পরাজয়ের চেয়ে এ রাতের তাৎপর্য ছিল মেসির বিদায়। শেষবারের মতো প্রিয় জাতীয় দলের জার্সিতে তাকে দেখতে স্টেডিয়ামে হাজির হয়েছিলেন হাজারো সমর্থক। মাঠে নামার আগে তিন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যান মেসি। গ্যালারি থেকে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনির স্নেহভরা শুভেচ্ছাও পান তিনি।
খেলা শুরুর আগে মাঠে বিছিয়ে দেওয়া হয় বিশাল আর্জেন্টিনা জার্সি। মেসির ১০ নম্বরের ওপরে লেখা ছিল ধন্যবাদ। দশম মিনিটে তার বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সির প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিটের জন্য খেলা থামিয়ে দেওয়া হয়। পুরো স্টেডিয়াম তখন করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে।
ম্যাচের প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা আক্রমণের গতি বাড়ায়। ৪৮ মিনিটে মেসির সহায়তায় গোল করেন ওতামেন্দি। ৬১ মিনিটে মেসির পাস থেকেই ব্যবধান দ্বিগুণ করেন নিকো পাজ। ১০ মিনিট পর পেনাল্টি থেকে গোল করে নিজের বিদায়ী ম্যাচের পূর্ণতা দেন মেসি।
শেষ বাঁশির পর সতীর্থ, প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা মেসিকে ঘিরে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানান। এরপর মনুমেন্টালের আকাশে শুরু হয় বিশেষ আলোক প্রদর্শনী। আকাশে ফুটে ওঠে মেসির প্রতিকৃতি, জানানো হয় তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
জাতীয় সংগীতের সময়ও আবেগ সামলাতে পারেননি মেসি। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের সাবেক সেনা ফ্যাবিও সান্তানার পাশে দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে দেখা যায় তাকে। এর আগে স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথেও অশ্রুসিক্ত ছিলেন তিনি। মেসি ও আর্জেন্টিনা দলের বাস ঘিরে তখন অসংখ্য সমর্থকের ভিড়।
বিদায়বেলায় সমর্থকদের উদ্দেশে মেসি জানান, দুই দশকের বেশি সময় আর্জেন্টিনার জার্সি পরতে পারা তার জীবনের বড় গর্ব। জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগকে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতাগুলোর একটি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে জানান, আরও অনেক দিন খেলতে চাইলেও বর্তমান সময়টিকেই নিজের জন্য সঠিক মনে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বিশ্বকাপের কঠিন অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা কঠিন সময়ও তার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে জানান মেসি। বিশেষ করে বিশ্বকাপের সময় প্রয়াত বাবার গুরুতর অসুস্থতার বিষয়টিও তার জন্য গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক অধ্যায় শেষ হলো ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোলের রেকর্ড নিয়ে। জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ও সবচেয়ে বেশি গোল-দুই রেকর্ডই এখন তার দখলে।
এই দীর্ঘ যাত্রায় আর্জেন্টিনাকে ২০২২ বিশ্বকাপে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার পাশাপাশি ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার শিরোপাও এনে দিয়েছেন মেসি। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয় ছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন, যার মাধ্যমে আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের বিশ্বকাপ-অপেক্ষার অবসান ঘটে।
জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হলেও মেসির পেশাদার ফুটবল জীবন এখনই শেষ হচ্ছে না। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে তার চুক্তি ২০২৮ সাল পর্যন্ত রয়েছে। তবে জাতীয় দলের জার্সিতে আর দেখা যাবে না বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর প্রিয় এই তারকাকে।
একটি প্রজন্মের কাছে মেসির বিদায় তাই কেবল একজন খেলোয়াড়ের অবসর নয়; এটি আর্জেন্টিনা ফুটবলের এক দীর্ঘ ও অসাধারণ অধ্যায়ের সমাপ্তি।

মেসি, আর্জেন্টিনা, বিদায়