নিরাপদ সড়ক শুধু স্লোগান নয়,রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারও

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-১০-০১ ০০:০৫:৩৪
image

নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ,সবার আগে বাংলাদেশ-এবারের জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬ এর প্রতিপাদ্য। একটি বাক্যে যেন বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাটিই প্রকাশ পেয়েছে। কারণ সমৃদ্ধির অর্থ শুধু সেতু,মহাসড়ক,উড়ালসড়ক কিংবা দ্রুতগতির যান চলাচল নয়; সমৃদ্ধির প্রকৃত মানদণ্ড হলো মানুষ সেই সড়কে কতটা নিরাপদে চলাচল করতে পারছে। যে উন্নয়নের পথে মানুষের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে থাকে,সেই উন্নয়নকে পূর্ণাঙ্গ বলা যায় না।
রোড ক্র্যাশ নিয়ে আমাদের প্রচলিত আলোচনা সাধারণত দুর্ঘটনার পর শুরু হয়। চালককে খোঁজা হয়, যানবাহনের ত্রুটি দেখা হয়,সড়কের গর্ত নিয়ে কথা হয়,ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সমালোচনা হয়। অথচ রোড ক্র্যাশ এর পেছনে অনেক সময় একাধিক ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করে। চালক,যানবাহন,সড়কের নকশা,গতি, গণপরিবহন ব্যবস্থা,আইন প্রয়োগ,পথচারী অবকাঠামো,জরুরি চিকিৎসা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়-সবকিছু মিলেই সড়কের নিরাপত্তা তৈরি হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ রোড ক্র্যাশে নিহত হয়। ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণও রোড ক্র্যাশ। একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ২০২১ সালের সরকারি হিসাবে নিহত ৫ হাজার ৮৪ জনের বিপরীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমান ৩১ হাজার ৫৭৮ জন। অনুমানের ভিত্তি ও সরকারি তথ্যের পদ্ধতি এক নয়-এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ব্যবধান আমাদের রোড ক্র্যাশ এর তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ ব্যবস্থাকে নতুন করে দেখার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে।
সাম্প্রতিক দেশীয় পরিসংখ্যানও স্বস্তির নয়। বিআরটিএর আসস্ট ২০২৬-এর হিসাবে ৪১৭টি রোড ক্র্যাশে ৪১৮ জন নিহত ও ৪৭৮ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১০৯ জনের। অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে আগস্ট মাসে ৫১৩ টি রোড ক্র্যাশে ৪৮১ জন নিহত ও ৬৬৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৬১ জন নারী ও ৫৮ জন শিশু রয়েছে।এসময় ১৮৩টি মোটরসাইকেল ক্র্যাশে ১৭৬ জন নিহত হয়েছেন,যা মোট নিহতের ৩৬.৫৯%।জুলাই মাসের তুলনায় আগস্টে রোড ক্র্যাশে দৈনিক গড় প্রাণহানি ১৫.৬৫% বেড়েছে।মূল পর্যবেক্ষণে প্রতীয়মান হয়- প্রতিবারের মতোই বিআরটিএ-এর সরকারি হিসেবের তুলনায় বেসরকারি সংগঠনগুলোর (যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশন) তথ্যে দুর্ঘটনা ও নিহতের সংখ্যা বেশি দেখা গেছে। তবে সবকটি প্রতিবেদনই স্পষ্ট নির্দেশ করে যে,আগস্ট মাসে মোটরসাইকেল ক্র্যাশ ছিল সবচেয়ে মারাত্মক এবং মোট প্রাণহানির এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী।আর দুই প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকলেও উভয় তথ্যই একই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে-সড়কে ঝুঁকি এখনো বড়।
এখানেই একটি জাতীয় ক্র্যাশ তথ্যভান্ডারের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। পুলিশ,বিআরটিএ, হাসপাতাল,ফায়ার সার্ভিস,সড়ক ও জনপথ এবং স্থানীয় সরকারের তথ্য একটি অভিন্ন কাঠামোয় যুক্ত হলে রোড ক্র্যাশের প্রকৃত চিত্র বোঝা সহজ হবে। কোথায় বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে,কোন বয়সের মানুষ বেশি মারা যাচ্ছে, কোন ধরনের যান বেশি ঝুঁকিপূর্ণ,কোন সড়ক বা মোড় বারবার রোড ক্র্যাশ এর কারণ হচ্ছে-এসব তথ্যের ভিত্তিতেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
চালককে দায়ী করা প্রয়োজন হলে অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু চালককে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে যাওয়া হবে না। আধুনিক নিরাপদ ব্যবস্থা পদ্ধতির মূল কথা হলো-মানুষ ভুল করতে পারে,কিন্তু সেই ভুল যেন মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতে পরিণত না হয়। এজন্য প্রয়োজন নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ গতি,নিরাপদ যানবাহন,দায়িত্বশীল সড়ক ব্যবহারকারী এবং ক্র্যাশ পর দ্রুত চিকিৎসা।
গতি নিয়ন্ত্রণ এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে গড় গতি এক শতাংশ বাড়লে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রায় চার শতাংশ বাড়তে পারে। তাই বিদ্যালয়,হাসপাতাল,বাজার,আবাসিক এলাকা ও পথচারীপ্রধান স্থানে বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত কম গতিসীমা কার্যকর করা জরুরি। শুধু গতিসীমা নির্ধারণ করলেই হবে না, তা বাস্তবে প্রয়োগের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
যানবাহনের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্রেক,টায়ার,আলো,আসনবেল্ট,জরুরি বহির্গমন ও অন্যান্য নিরাপত্তা উপকরণের বাস্তব পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে গণপরিবহনকে কাগজপত্রনির্ভর নয়, নিরাপত্তামাননির্ভর ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।
ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় রুটের বিশৃঙ্খলা,অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা,যাত্রী ওঠানামার অনিয়ম এবং চালকের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা নিরাপত্তাকে দুর্বল করে। তাই রুটভিত্তিক বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে কোম্পানিভিত্তিক গণপরিবহন,নির্ধারিত স্টপেজ,নির্দিষ্ট সময়সূচি,চালকের কর্মঘণ্টার সীমা,যাত্রী অভিযোগের কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত যানবাহন পরীক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।
প্রয়োজনে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন নিয়েও ভাবতে হবে। এমন আইন কেবল অপরাধের শাস্তি বাড়াবে না; বরং সড়ক নির্মাণ,যানবাহনের নিরাপত্তা,চালকের কর্মঘণ্টা,গতি নিয়ন্ত্রণ,দুর্ঘটনার তথ্য,জরুরি চিকিৎসা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব স্পষ্ট করবে।
নিরাপদ সড়ক দিবস তাই কেবল র‌্যালি, আলোচনা সভা কিংবা ব্যানারের দিন হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনার দিন। প্রতিটি প্রাণহানির পর শুধু দায়ী ব্যক্তি খোঁজা নয়-ঝুঁকিটি আগে শনাক্ত করা হয়েছিল কি না,কেন তা দূর করা হয়নি এবং ভবিষ্যতে একই ঘটনা ঠেকাতে কী পরিবর্তন আনা হলো-এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও চাইতে হবে।
রোড ক্র্যাশ নিয়তি নয়। মানুষের ভুল থাকবে,কিন্তু নিরাপদ ব্যবস্থা সেই ভুলের মূল্য যেন জীবন দিয়ে দিতে না হয়,তা নিশ্চিত করতে পারে। তাই নিরাপদ সড়ক কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র,প্রতিষ্ঠান,চালক,মালিক,পথচারী ও নাগরিক-সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশের শর্ত। আর মানুষের জীবন রক্ষা সেই সমৃদ্ধির প্রথম পরিচয়।

লেখক: কলামিস্ট,সামাজিক কর্মী ও ভাইস চেয়ারম্যান-নিরাপদ সড়ক চাই কেন্দ্রীয় কমিটি