কন্যাশিশুর জন্য নিরাপদ শৈশবই হোক বাংলাদেশের নতুন অঙ্গীকার

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৯-৩০ ১৬:৪১:০৭
image

একটি মেয়ে স্কুলের পোশাক পরে বই হাতে বেরিয়েছে। তার চোখে পরীক্ষার চিন্তা, বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ, বড় হয়ে কী হবে-সেই অজানা স্বপ্ন। অথচ কোনো কোনো ঘরে সেই একই বয়সী একটি মেয়ের সামনে বইয়ের বদলে তুলে দেওয়া হয় সংসারের দায়িত্ব, কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয় পরিবারের দুশ্চিন্তা, আর কখনো কখনো তার শৈশব শেষ হয়ে যায় বিয়ের সিদ্ধান্তে। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ।
৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। বাংলাদেশে ২০০০ সাল থেকে দিনটি পালিত হয়ে আসছে কন্যাশিশুর শিক্ষা, পুষ্টি, অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বাল্যবিবাহ ও বৈষম্য প্রতিরোধের সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে।
কিন্তু একটি দিবসের সবচেয়ে বড় সাফল্য কতটি অনুষ্ঠান হলো, তা নয়; বরং পরদিন একটি কন্যাশিশুর জীবন কতটা নিরাপদ হলো, সেটিই আসল প্রশ্ন।
কন্যাশিশুর অধিকার শুরু হয় জন্মের পর থেকেই। পরিবারের প্রথম খাবারের ভাগে তার সমান অধিকার আছে। অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে। বিদ্যালয়ে যাওয়ার অধিকার আছে। নিজের মত প্রকাশের অধিকার আছে। ভয়, নির্যাতন ও বৈষম্য থেকে নিরাপদ থাকার অধিকারও আছে।
শিক্ষার বিষয়টি এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি মেয়েকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখা মানে শুধু একজন শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া নয়; তার সামনে ভবিষ্যতের অনেকগুলো দরজা খুলে দেওয়া। শিক্ষা তাকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ায় এবং জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিজের পক্ষে কথা বলার শক্তি দেয়। জাতিসংঘের শিশু অধিকার ও টেকসই উন্নয়ন কাঠামোতেও ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 
অন্যদিকে পুষ্টির ঘাটতি কন্যাশিশুর বিকাশকে নীরবে বাধাগ্রস্ত করে। অনেক পরিবারে খাদ্য বণ্টনের সময় মেয়েশিশু অগ্রাধিকার পায় না। এই বৈষম্য চোখে সবসময় ধরা পড়ে না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে। তাই কন্যাশিশুর পুষ্টি কোনো পারিবারিক অনুগ্রহ নয়; এটি তার অধিকার।
সুরক্ষার প্রশ্নটিও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঘর, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, রাস্তা কিংবা অনলাইন-কোথাও যেন কন্যাশিশু হয়রানি, নির্যাতন বা শোষণের শিকার না হয়, সেই পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবার। শুধু মেয়েটিকে সতর্ক থাকতে বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না; যে পরিবেশে ঝুঁকি তৈরি হয়, সেটিও নিরাপদ করতে হবে।
আর বাল্যবিবাহ? এটি একটি শিশুর হাতে থাকা ভবিষ্যতের দরজা অকালেই বন্ধ করে দেয়। দরিদ্রতা, সামাজিক চাপ, নিরাপত্তার ভয়, প্রচলিত ধারণা কিংবা লোকলজ্জা-বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে যখন একটি মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তখন আসলে তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা ও স্বপ্ন-সবকিছুর ওপর চাপ তৈরি হয়।
তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়। জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া মেয়েদের খোঁজ নেওয়া, পরিবারকে সচেতন করা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষকদের সক্রিয় করা এবং আইন প্রয়োগ-সবকিছু একসঙ্গে করতে হবে।
আমাদের আরও একটি মানসিক পরিবর্তন প্রয়োজন। কন্যাশিশুকে শুধু ভবিষ্যতের মা হিসেবে দেখার পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সে নিজেই একজন পূর্ণ মানুষ, তার নিজস্ব স্বপ্ন আছে, প্রতিভা আছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। সে বিজ্ঞানী হতে পারে, চিকিৎসক হতে পারে, শিক্ষক, প্রকৌশলী, শিল্পী, উদ্যোক্তা কিংবা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে আসতে পারে। তার সম্ভাবনার পরিচয় তার লিঙ্গ নয়, তার সামর্থ্য।
আজকের কন্যাশিশুকে নিরাপদ শৈশব দিলে আগামী দিনের বাংলাদেশ পাবে আত্মবিশ্বাসী নাগরিক। তাকে শিক্ষিত করলে পরিবার শিক্ষিত হবে। তাকে পুষ্টি দিলে একটি প্রজন্ম শক্তিশালী হবে। তাকে অধিকার দিলে সমাজ আরও ন্যায়ভিত্তিক হবে। আর বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা করলে একটি জীবন তার নিজের মতো করে গড়ে ওঠার সময় পাবে।
জাতীয় কন্যাশিশু দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত খুব সরল-কোনো মেয়ের শৈশব যেন দারিদ্র্য, ভয়, বৈষম্য কিংবা বিয়ের চাপে হারিয়ে না যায়।
(একটি কন্যাশিশুকে বাঁচানো মানে শুধু একটি জীবনকে রক্ষা করা নয়; তার ভেতরে বেড়ে ওঠা সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকেও রক্ষা করা।)


লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট।