সুইজারল্যান্ডের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতার নীতি সংবিধানে আরও কঠোরভাবে করার প্রস্তাব নিয়ে রোববার গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশটির কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন পাওয়া এই উদ্যোগকে ঘিরে দেশটিতে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে অবশ্য প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোটের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
সুইজারল্যান্ডের সরাসরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। তবে দেশটির অধিকাংশ ভোটার আগেই ডাকযোগে ভোট দিয়ে থাকেন।
প্রস্তাবটি পাস হলে সংবিধানে সুইজারল্যান্ডের নিরপেক্ষতাকে সশস্ত্র ও চিরস্থায়ী হিসেবে উল্লেখ করার বিধান যুক্ত হবে। এর ফলে দেশটি আক্রান্ত না হলে কোনো সামরিক জোটে যোগ দিতে পারবে না এবং সামরিক জোটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হবে। জাতিসংঘের আহ্বান ছাড়া অন্য দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ থাকবে।
সুইজারল্যান্ডের নিরপেক্ষতার ঐতিহ্য ১৫১৬ সাল থেকে চলে আসছে এবং ১৮১৫ সাল থেকে তা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে দেশটি সামরিক সক্ষমতা বজায় রেখে নিরপেক্ষ থাকার নীতি অনুসরণ করে আসছে। তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ শুরুর পর বিদেশি সংঘাতে সুইজারল্যান্ডের অবস্থান এবং নিরপেক্ষতার প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাশিয়াবিরোধী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় সুইজারল্যান্ডের অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ থেকে সার্বভৌমত্বপন্থী সংগঠন প্রো সুইজারল্যান্ড গণভোট আয়োজনের প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর সংগ্রহ করে। রাশিয়া সুইজারল্যান্ডের নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেওয়ার সমালোচনা করে আসছে এবং এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীরা উদ্যোগটিকে রাশিয়াপন্থী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
সুইস সরকার ও পার্লামেন্ট প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে। সরকারের যুক্তি, নিরপেক্ষতার সংজ্ঞা অতিরিক্ত কঠোর করে দিলে বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইগনাজিও ক্যাসিসও বলেছেন, নিরপেক্ষতা ঐতিহাসিকভাবে কিছুটা নমনীয়তার সঙ্গে প্রয়োগ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিরপেক্ষতার অর্থ আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নীরব থাকা নয়।
দেশটির প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশই প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে। ব্যতিক্রম হিসেবে রয়েছে সুইস পিপলস পার্টি, দেশটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল, যারা উদ্যোগটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলটির ভাইস প্রেসিডেন্ট সেলিন আমোদরু বলেছেন, শান্তি, কূটনীতি ও সংলাপের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনে চিরস্থায়ী সশস্ত্র নিরপেক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ।
শুরুতে কয়েকটি জরিপে ভোটের ফলাফল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিললেও সর্বশেষ দুই জরিপে ৬০ শতাংশের বেশি ভোটার প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন বলে দেখা গেছে। তবে এগুলো ভোটের চূড়ান্ত ফল নয়।
এদিন সুইজারল্যান্ডে খাদ্যে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর আরেকটি প্রস্তাব নিয়েও গণভোট হচ্ছে। এতে ২০২৪ সালের ৪২ শতাংশ থেকে দেশের খাদ্যে স্বনির্ভরতার হার বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করার লক্ষ্য নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকার বলেছে, এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন, এমনকি সম্ভব নাও হতে পারে। সাম্প্রতিক জরিপে এই প্রস্তাবের বিরোধিতার প্রবণতাও বেশি দেখা গেছে।
সুইজারল্যান্ড, নিরপেক্ষতা, গণভোট