প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশির ভাগ কাজ মনে হয় না একটি পরিপত্রে হয়

  • রীতা রায়
  • ২০২৩-০৯-২৬ ১০:২৭:০৪
image

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশির ভাগ কাজ মনে হয় না একটি পরিপত্রে হয়।কারণ একই কাজের জন্য নির্ধারিত ফর্ম দুই, অনেক সময় দুয়ের ও অধিক বার পরিবর্তন হয়।এতে কি হয়? এতে শিক্ষক শিক্ষা দানের পরিবর্তে অফিসের কাজেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পরে। তাছাড়া প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি হওয়ায়, যে কোন শিক্ষক কে   যদিও প্রধান শিক্ষক কে বেশির  ভাগই যে কোন কাজের জন্য মানসিক ভাবে তৈরি থাকতে হয়।তাই বাইরে থেকে কথা না বলে আসুন শুধু একদিন স্কুল চালান।শিক্ষার্থীদের সাথে কোন রকম উচ্চবাচ্য না করে, শাসন না করে স্কুল চালিয়ে দেখিয়ে দিন।পারবেন?  মনে হয় না। এ অন্তত একবার হলেও তাদেরকে চুপ করানোর প্রয়োজন আছে। আর তাদেরকে মিষ্টি কথায় চুপ করিয়ে দিন।পারবেন?    মনে হয় নয়।  যেখানে বাড়িতে একটা বা দুটি সন্তানকে মেইনটেইন করতে হিমসিম খেয়ে যান সেখানে একসাথে অনেক শিশুকে মেইনটেইন করা   পূর্ব অভিজ্ঞতা  ছাড়া অসম্ভব। তাহলে ভাবুন তো,প্রাথমিক শিক্ষক গণ কিভাবে শুধু মৌখিক কথা দ্বারা এই অসাধ্য সাধন করে?  যেখানে বলা হয়েছে যে,শিশুদের কোন রকম শারীরিক বা মানসিক শাস্তি দেওয়া যাবেনা।মানসিক শাস্তি হলো, যে কথা দ্বারা শিশুমনে আঘাত হানে, সেই বাক্য বলা নিষেধ।কান ধরে উঠবস করা, বেত্রাঘাত করা এসব কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে যেসব বাবা- মায়েরা তাদের আদরের সোনামণিকে   কিন্ডারগার্টেনে পৌঁছে দিয়ে আসেন।হয়তো অনেক পিতা মাতাই সন্তানের শরীরে বেত্রাঘাতের চিহ্নের বিষয়টা এড়িয়ে চলেন।হয় পিতা মাতাসহ সন্তানের হোমওয়ার্ক মুখস্থ করতে হয়,নয়তো সোনামণিকে বেত্রাঘাতের আঘাত সহ্য করতে হয়। সেখানে শুধু পড়া নয়, নিয়ম - শৃঙ্খলা, পোশাক, সময় মেইনটেইন ইত্যাদি কারণে তা সহ্য করতে হয়। সম্মানিত সাংবাদিক ভাইয়েরা এসব অবগত আছেন।  

এবারে আসি কিন্ডারগার্টেনে শিশুদের ভর্তি হওয়ার কারণ ঃ প্রথমত, পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যাঃ কিন্ডারগার্টেন সিলেবাসে যেসব সাবজেক্ট শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে    থাকে,যেটা অভিভাবকদের আকৃষ্ট করে। অভিভাবক গণ এটা ভেবে নেন যে,এসব পাঠের সবটুকু শিশু আয়ত্ত্ব করতে না পারলেও অনেক কিছুই জানতে পারবে। অন্য দিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক গুলো কিন্ডারগার্টেন এর পাঠ্যপুস্তকের তুলনায় কম তথ্যবহুল।যা অভিভাবকদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম নয়। এছাড়াও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কতগুলো বিষয়ের  সহায়িকা দ্বারা ক্লাস ও পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়।এই কারণেই অভিভাবকগণ এসব বিষয়ের পাঠ্যপুস্তক দেখতে পান না।কারণ এসব পাঠ্যপুস্তক শিশুদের কাছে থাকে,যা অভিভাবকদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য নিরুৎসাহিত করে। এছাড়াও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগীতা চলাকালীন সময়ে পাঠদান কিছুটা ব্যাহত হয় যা অভিভাবকদের মনে শিশুদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে অন্তরায়  মনে হয়।সেই তুলনায় কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ছুটি কম থাকে এবং অন্যান্য কার্যক্রম কম থাকায় পাঠদানের সময় ও সংখ্যা  বেশি যা অভিভাবকদের সহজেই আকৃষ্ট করে।তাই দেশে একই শ্রেণির জন্য একই সিলেবাস ও পাঠ্যপুস্তক চালু থাকা আবশ্যক। বাংলা বা ইংরেজি মাধ্যম থাকতে পারে কিন্তু পাঠ্যপুস্তক ও সিলেবাসের ভিন্নতা কাম্য নয়।যা সমাজে বিভিন্ন মতামতের সৃষ্টি করে এটা কখনোই শুভদায়ক নয়। 
এবার আসল কথায় আসি,গ্রামীণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি নিয়েঃ গ্রাম্য পরিবেশে যেসব পরিবার বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বাড়িতেও শিশুদের লেখাপড়ার বিষয়ে সচেতন তাদের সিংহভাগই কিন্ডারগার্টেন এর উপর আস্থা রাখে। আর যেসব দরিদ্র পরিবারের যেসব শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠগ্রহণ করতে আসে তাদের ৯০% অভিভাকই শ্রমজীবী। তাই লেখাপড়ার বিষয়ে তেমন সচেতন নয়। কারণ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তারা ব্যস্ত। ভোর রাতে রান্না শেষে তারা নিজেদের দুপুরের খাবার বেঁধে কাজে বের হয়, ফিরে শেষ বিকেল বা প্রথম সন্ধায়। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম শেষে তারা আর শিশুদের লেখাপড়ার বিষয়ে খোঁজ রাখতে সক্ষম হয় না। এমতাবস্থায় বেশিরভাগ শিশুই অভিভাবকদের কাছ থেকে উৎসাহ না পেয়ে নিরুৎসাহিত হয়ে পরে।যেটা শুধুমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বারা বা শ্রেণি পাঠদানের দ্বারা কাটিয়ে উঠা সম্ভবপর নয়। এবং যার ফল শিক্ষকদের ভোগ করতে হয়।
এছাড়াও  অপর্যাপ্ত উপবৃত্তি গ্রামের শিশুদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে একটা বড় অন্তরায় বলে প্রতীয়মান হয়। কারণ যেখানে রবিশস্য তোলার সময় প্রতিশিশু প্রতিদিন কমপক্ষে  ১০০ টাকা উপার্জন সম্পত্তির, সেখানে মাসে ১০০ টাকা উপবৃত্তি তাদের কাছে কিছুই নয়।যা তাদেরকে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বিষয়ে নিরুৎসাহিত করে। এ বিষয়ে বলতে গেলে প্রতি মাসে একজন শিশুর কমপক্ষে ১৫০০-২০০০ টাকা উপবৃত্তি প্রদান করতে পারলে শতভাগ শিশু বিদ্যালয় মুখি হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।  এ বিষয়ে সরকারের অবশ্যই ভেবে দেখা দরকার। কারণ, দারিদ্রের কাছে, পূর্ণিমার চাঁদ সবসময়ই ঝলসানো রুটি ছাড়া আর কিছুই নয়।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের অনুপস্থিতির আরেকটি মূখ্য কারণ শিশুদের বয়স ও দারিদ্রতা। কারণ ৩য়,৪র্থ ও ৫ ম শ্রেণির বয়সী শিশুদের প্রায় প্রত্যেক শিশুরই ছোট ভাই- - বোন থাকে যা তাদেরকে দেখভাল করতে হয়।কারণ দরিদ্র পরিবারে পিতা একা সংসারের ভার বহন করতে সমর্থ নয়।তাই কোলের শিশুকে অপেক্ষাকৃত বড় শিশুকে দেখার দায়িত্ব দিয়ে  মাকেও কাজে যেতে হয়।এটা একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর লেখাপড়া অর্জনের পথে বড় অন্তরায় বলে প্রতীয়মান হয়।
এজন্য সরকার প্রতিটি দরিদ্র পরিবারকে বাছ- বিচার ছাড়াই মানসম্মত  মাসিক ভাতা চালু করা প্রয়োজন। এতে  যেমন শিশুশ্রমের হার কমে আসবে তেমনি শিশু তার মায়ের আদর - যত্ন পাবে এবং বিদ্যালয়ে শতভাগ শিশুর উপস্থিতি নিশ্চিত হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

শিক্ষক, কবি লেখক