একনেকে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার ১২ প্রকল্প অনুমোদন

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৬-০৯-১৭ ১১:১৬:০৪
image

রাজধানীর পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে মোট ১২টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ।
বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে চলতি অর্থবছরের একনেকের তৃতীয় সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সভা শেষে শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি ও পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার সাংবাদিকদের প্রকল্পগুলোর বিষয়ে জানান। 
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৪৮ হাজার ২৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ ১ লাখ ২০ হাজার ৪৬৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ৫৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা আসবে। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প সাতটি এবং সংশোধিত প্রকল্প পাঁচটি।
সভায় ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুটের নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেট্রোরেল করিডোরের ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে ভূগর্ভস্থ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকার দেবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল থেকে ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।
একই সভায় এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের সংশোধিত প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে। ফলে এই দুই চলমান প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০১৯ সালে অনুমোদনের সময় এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের সম্মিলিত প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৯৩ হাজার ৭৯৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। সংশোধনের পর দুই প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ আগের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা বা ১১৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
এমআরটি লাইন-১ বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত উড়াল শাখাসহ মোট ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। ২০১৯ সালে প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে ৬১ হাজার ৮৩৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বা ১১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
সংশোধিত ব্যয়ের মধ্যে সরকারের অনুদান বেড়ে দাঁড়াবে ৩০ হাজার ৫৫২ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার ঋণ দাঁড়াবে ৮৩ হাজার ৮৪২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে নকশা ও দরপত্র প্রস্তুতে বিলম্ব এবং দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল বাস্তবায়নের জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের সময় কয়েকটি স্টেশনের আকার বাড়ানো, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং বায়ু চলাচলের কাঠামোর অবস্থান পরিবর্তন, রাজারবাগে তিনতলা স্টেশন নির্মাণ এবং নির্মাণকাজের সময় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে প্রায় ২০ কিলোমিটার বিকল্প সড়ক নির্মাণের ব্যয়ও যুক্ত হয়েছে।
এদিকে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের ব্যয়ও সংশোধন করা হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রকল্পটির ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে ৪৮ হাজার ৬০৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা বা ১১৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
সংশোধিত প্রকল্পে সরকারের অনুদান বেড়ে দাঁড়াবে ২২ হাজার ৩৩০ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং জাইকার ঋণ হবে ৬৭ হাজার ৫১৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
এই রুটে হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার অংশ উড়ালপথে এবং আমিনবাজার থেকে ভাটারা অংশ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্য দিয়ে ভূগর্ভস্থ পথে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে চালুর প্রাথমিক লক্ষ্য থাকলেও সংশোধিত প্রস্তাবে সমাপ্তির সময় ২০৩২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
একনেকে অনুমোদিত ১২ প্রকল্পের মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দুটি এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি করে প্রকল্প রয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অন্য দুটি প্রকল্পের মধ্যে ৯৪৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজশাহী সড়ক জোনের জেলা মহাসড়ক উন্নয়ন এবং ১ হাজার ৪৫৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম সড়ক জোনের জেলা মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্প হলো ১ হাজার ১৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে বরিশাল সেনানিবাস স্থাপন এবং ৩৭৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে খুলনা নৌ অঞ্চলে নৌ সদস্যদের আবাসনসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ।
পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের খুলনা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম সংশোধনে অতিরিক্ত ২৭০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পের মধ্যে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর সেকশনে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন বাস্তবায়ন এবং ৪ হাজার ৬৬৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প রয়েছে।
এ ছাড়া শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে টেক্সটাইল ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৫২ কোটি ৮১ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ে মনপুরা দ্বীপাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সভায় পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের ১৫টি প্রকল্প সম্পর্কেও একনেককে অবহিত করা হয়। এসব প্রকল্পের মধ্যে ভূমি ব্যবস্থাপনা স্বয়ংক্রিয়করণ, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় সদর দপ্তর নির্মাণ, ভাসানচরে সবুজ বেষ্টনী ও কক্সবাজারে বনায়ন, দেশি মুরগি গবেষণা ও উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং ঝুঁকিপূর্ণ সেতু প্রতিস্থাপনসহ বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে।
একনেকের এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজধানীর গণপরিবহন অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ, প্রতিরক্ষা ও শ্রমিক কল্যাণমূলক অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন ও সংশোধিত প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ তৈরি হলো।

একনেক, মেট্রোরেল, উন্নয়ন প্রকল্প