মহেশখালী (কক্সবাজার)
মহেশখালী চ্যানেলের ভারুয়াখালী মোহনা ও বাঁকখালী মোহনা থেকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলনে চার মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। রুলের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের এসব এলাকা থেকে ড্রেজিং করে বালু উত্তোলন থেকে বিরত থাকার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আদালতের আদেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি প্রশাসনের দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু আদালতের এমন সুস্পষ্ট নির্দেশনার পরও নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত এলাকায় বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকার অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসনের ভূমিকা কী এবং আদালতের আদেশের পরও কীভাবে ড্রেজার চলছে? অনুমোদন এক জায়গায়,উত্তোলনের অভিযোগ অন্যত্র মহেশখালী চ্যানেল থেকে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক নতুন নয়। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের পোর্ট এক্সেস রোড নির্মাণের জন্য ‘টোকিও-ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (এমআইএল) জেভি’কে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয় কক্সবাজার জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য মহেশখালীর হামিদারদিয়া ও ঠাকুরতলা মৌজা থেকে ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। অনুমোদনটি একাধিক শর্তসাপেক্ষে দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত স্থান ও শর্তের বাইরে মহেশখালী চ্যানেল, ভারুয়াখালী মোহনা, বাঁকখালী মোহনা এবং আদিনাথ পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হয়েছে।
এতে শুধু অনুমোদনের শর্ত লঙ্ঘনের প্রশ্নই নয়, নদী ও উপকূলীয় পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই উত্তোলনের অভিযোগ,জরিমানা বালু উত্তোলন নিয়ে পরিবেশগত প্রশ্নও উঠেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) ও পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া বালু উত্তোলনের অভিযোগে টোকিও-এমআইএল (জেভি)-কে ৫০ লাখ ৩৭ হাজার ৭৮০ টাকা জরিমানা করে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও কর্তৃপক্ষের কাছে আইনি নোটিশ পাঠানোর তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়া বালু উত্তোলনের ফলে নদীভাঙন, জলপ্রবাহের পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং উপকূলীয় পরিবেশের ঝুঁকির আশঙ্কা তুলে ধরা হয়।
হাইকোর্টে রিট, চার মাসের নিষেধাজ্ঞা
জনস্বার্থে মহেশখালী চ্যানেল থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে মহেশখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক মো. জয়নাল আবেদীন হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ.এফ.এম. সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আবেদনটির শুনানি নিয়ে ভারুয়াখালী মোহনা ও বাঁকখালী মোহনা থেকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলনে চার মাসের নিষেধাজ্ঞা দেন।
আদালতের এই আদেশের পরও যদি নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন এলাকায় বালু উত্তোলন চলতে থাকে, তাহলে তা আদালতের আদেশের কার্যকারিতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
একদিন বন্ধ, ফের ড্রেজিং অভিযোগ স্থানীয়দের
স্থানীয়দের অভিযোগ, আদালতের আদেশের পর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ রাখলেও পরবর্তী সময়ে আবারও ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
তাদের দাবি, আদালতের আদেশ কার্যকর করতে হলে শুধু কাগজে নির্দেশনা জারি করলেই হবে না; নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন এলাকায় ড্রেজার চলাচল বন্ধ, অনুমোদিত ও অননুমোদিত উত্তোলনস্থল চিহ্নিতকরণ এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রশাসনের যথাযথ নজরদারির অভাবেই অনুমোদিত এলাকার বাইরে বালু উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা,মহেশখালী একটি উপকূলীয় ও পাহাড়ি দ্বীপাঞ্চল। চ্যানেল, নদী, মোহনা, পাহাড় ও উপকূলীয় প্রতিবেশ এখানকার জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
মহেশখালী পরিবেশবাদী সংগঠন বাপার সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর ছিদ্দিক বলেন, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া বা অনুমোদিত এলাকার বাইরে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। দ্রুত অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, মোহনা ও চ্যানেলের তলদেশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও তলদেশের গঠন পরিবর্তিত হতে পারে। এর প্রভাব নদীভাঙন, তীরবর্তী বসতি এবং উপকূলীয় প্রতিবেশে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বালুর অনুমতি, রাজস্ব ও বাজারমূল্য নিয়েও প্রশ্ন
মহেশখালী চ্যানেল থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি ও মূল্য নিয়েও ইতোমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে প্রতি ঘনফুট বালুর দাম প্রায় ১৬ টাকা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে কম দামে বালু সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই প্রতিবেদনে জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। এ কারণে এখন কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে অনুমোদিত এলাকার বাইরে বালু তোলা হয়েছে কি না? পরিবেশগত ছাড়পত্র ও ইআইএ ছাড়া উত্তোলন কীভাবে চলল?
অনুমতির শর্তগুলো বাস্তবে কতটা মানা হয়েছে?
আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও যদি ড্রেজার চলে থাকে, তার দায় কার?এবং বালু উত্তোলনের পুরো প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
‘আদালতের আদেশ না মানলে আবার আদালতে যাব’
রিটকারী সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন বলেন, “জেলা প্রশাসক যদি আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করেন, তাহলে সাধারণ মানুষ আইনের আশ্রয় নেবে কীভাবে? আদালতের আদেশ অমান্য হলে বিষয়টি নিয়ে আবারও আদালতের শরণাপন্ন হব।”
অন্যদিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আদালতের আদেশটি অফিসে দেখে বিষয়টি জানাবেন বলে জানান।
এখন নজর বাস্তবায়নে,মহেশখালী চ্যানেল থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি এখন শুধু স্থানীয় পরিবেশ বা বালুমহাল ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাইকোর্টের সরাসরি নিষেধাজ্ঞা।
ফলে আদালতের আদেশের পর নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন এলাকায় কোনো ড্রেজার চলছে কি না, অনুমোদিত এলাকার সীমানা কোথায়, অনুমোদনের শর্ত মানা হয়েছে কি না এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়টি কী অবস্থায় এসব বিষয়ে প্রশাসনের প্রকাশ্য ও স্বচ্ছ অবস্থান জরুরি।
আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে গাফিলতি বা অনীহার অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক জবাবদিহির বিষয় নয়; আদালতের নির্দেশনার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করবে।
মহেশখালী চ্যানেলের বালু উত্তোলন নিয়ে এখন তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আদালতের নিষেধাজ্ঞা কি কাগজেই থাকবে, নাকি বাস্তবে বন্ধ হবে ড্রেজারের কার্যক্রম?