৩৭ বছরে এনডিপি:দীর্ঘ পথচলা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যাশা

  • মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা
  • ২০২৬-০৯-০৯ ১৯:২৪:০৮
image

১৯৮৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। দেশবরেণ্য সাংবাদিক, রাজনীতিক ও জননেতা আনোয়ার জাহিদের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার,গণতন্ত্র,দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধকে ধারণ করে আত্মপ্রকাশ করে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এনডিপি।
দীর্ঘ ৩৭ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় নানা চড়াই-উতরাই, রাজনৈতিক সংকট, দমন-পীড়ন, কারাবরণ ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে দলটি আজও তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর এনডিপি পালন করতে যাচ্ছে তার ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে দলের পক্ষ থেকে স্মরণ করা হচ্ছে এনডিপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জননেতা আনোয়ার জাহিদ, প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও এনডিপি থেকে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য জননেতা শহীদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রয়াত সব নেতাকর্মীকে। একই সঙ্গে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ মুগ্ধ, শহীদ সাংবাদিক মেহেদী হাসানসহ সব শহীদকে।
দলের পক্ষ থেকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আহতদের দ্রুত সুস্থতা এবং প্রয়োজনীয় উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করারও দাবি জানানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে বর্তমান চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে দলের নানা সংকট ও দুর্যোগপূর্ণ সময়ে খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দলকে সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।
এনডিপির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন একসময়ের প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা আলমগীর মজুমদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য হাবিবুর রহমান চৌধুরী, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক মো. আলমসহ আরও অনেকে। তাদের অনেকেই আজ আর নেই। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই সময়ে দলীয় নেতাকর্মীরা তাদের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন।
দলের ভাষায়, প্রতিষ্ঠাতাদের শূন্যস্থান কখনো পূরণ হওয়ার নয়; তবে তাদের আদর্শ ও রাজনৈতিক স্বপ্নকে সামনে রেখেই এনডিপির পথচলা অব্যাহত রয়েছে।
২০১৪ সালে এনডিপির ২৫ বছর পূর্তি জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়। এর কিছুদিন পর দলটি আবারও সাংগঠনিক সংকটে পড়ে। নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সেই সংকট কাটিয়ে বর্তমানে দলটি দেশব্যাপী সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করার দাবি করছে।
তৃণমূল থেকে উঠে আসা,সাবেক ছাত্রনেতা ও কারা নির্যাতিত নেতা মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা বর্তমানে দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দলের নেতাকর্মীদের মতে, তৃণমূলের রাজনীতি ও রাজপথের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি সংগঠনকে আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছেন।
এনডিপির রাজনৈতিক দর্শনে অর্থ, প্রভাব কিংবা ক্ষমতার চেয়ে কর্ম ও সাংগঠনিক যোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দলটির নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও কর্ম,ত্যাগ ও রাজনৈতিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ-এমন দাবি দলটির নেতাদের। এনডিপির বর্তমান চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা দলের দীর্ঘ পথচলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক জাসদ ছাত্রনেতা এবং রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে বিভিন্ন সময়ে নির্যাতন ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়। তার রাজনৈতিক দর্শনে বাহুবলের পরিবর্তে মেধা, যোগ্যতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দলের নেতাকর্মীদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এনডিপিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের বিভিন্ন দাবিতে দলটি রাজপথে কর্মসূচি পালন করেছে।
গণতন্ত্র, ভোটার অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নেও এনডিপি দীর্ঘদিন ধরে সরব রয়েছে বলে দলটির নেতারা দাবি করেন।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে-এমনটাই মনে করে এনডিপি। দলটির মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, গুম, খুন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার পর রাষ্ট্র সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
দলটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়েছিল এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংবিধান সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের দাবির প্রেক্ষাপটে গুম তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়টিকেও এনডিপি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছে। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে দলটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করে।
এনডিপির এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বার্তায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার কথাও উঠে এসেছে।
দলের পক্ষ থেকে নতুন সরকার ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানিয়ে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে, যেখানে নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত হবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, ন্যায়বিচার কার্যকর হবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এনডিপির প্রত্যাশা-বাংলাদেশ হবে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র; যেখানে রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ মানুষ তার ন্যায্য অধিকার নিয়ে দাঁড়াতে পারবেন এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে কেউ নিপীড়নের শিকার হবেন না।
৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এনডিপি ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দলীয় কার্যালয়ে আলোকসজ্জার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। সকাল ৭টায় জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।
এরপর বেলা ১১টায় তোপখানা রোডস্হ বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ এর ভিআইপি সেমিনার কক্ষে এনডিপির ৩৭ তম  প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় ঐক্যের প্রতীক বর্তমান বাংলাদেশ শীর্ষক  আলোচনা শেষে কেক কাটার কর্মসূচিও থাকবে।
এনডিপির কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি জেলা, মহানগর ও বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটকে নিজ নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এনডিপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজার সভাপতিত্বে এবং দলের মহাসচিব মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসার সঞ্চালনায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন।
অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন প্রেসিডিয়াম সদস্য নাজমুন নাহার মিনতি, অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন ভূইয়া, অনামিকা আজমী, ভাইস চেয়ারম্যান রাজু আহমেদ, আশরাফুজ্জামান, মো. সাইফুল ইসলাম, শাহজাদী আয়েশা সিদ্দিকা, যুগ্ম মহাসচিব  গোলাম মোস্তফা রাজু মো.আজগর হোসেন,হায়াত মাহমুদ, দপ্তর সম্পাদক কামাল হোসেন, সহকারী মহাসচিব মোস্তফা মনির, খন্দকার জাহিদ, আরকে রিপন, ঢাকা মহানগর সদস্য সচিব আবদুর রহিম জাহিদসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
৩৭ বছরের পথচলায় এনডিপির সামনে এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের এই সময়ে দলটি নিজেদের সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
এনডিপির চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা এবং মহাসচিব মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা মনে করেন, রাষ্ট্র সংস্কার, গণতন্ত্র, ভোটার অধিকার, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া একটি কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
তাদের প্রত্যাশা-বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যেখানে ক্ষমতা জনগণের জন্য, রাষ্ট্র জনগণের জন্য এবং রাজনীতি হবে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার।
৩৭ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার এই সন্ধিক্ষণে এনডিপির অঙ্গীকার তাই একটাই-ত্যাগের রাজনীতিকে ধারণ করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখা।
প্রতিষ্ঠাতা আনোয়ার জাহিদের রাজনৈতিক স্বপ্ন, দলের প্রয়াত নেতাকর্মীদের ত্যাগ এবং বর্তমান নেতৃত্বের সাংগঠনিক প্রচেষ্টাকে সঙ্গে নিয়ে এনডিপি আগামী দিনের বাংলাদেশে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে চায়।
৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এনডিপির প্রত্যাশা-একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

লেখক: মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা, মহাসচিব, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এনডিপি