মাহবুব আলম চাষী:পরিবর্তন সংস্কৃতির এক অনন্য পুরোধা

  • মোঃ হায়দার আলী খান
  • ২০২৬-০৯-০৪ ০৯:১১:৫৭
image

মাহবুব আলম চাষী। দেশ গঠনের অনন্য এক আদর্শিক সংগঠক, এক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশের) পরনির্ভরতার নিদারূণ অবস্থা থেকে উত্তরণ ও মুক্তির পথ খুজছিলেন তিনি। এজন্য ছেড়েছিলেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোভনীয় চাকরি। সারা দেশে কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ঘটাতে পারলে দেশের পরনির্ভরতার গøানি সমৃদ্ধির সম্মানে পরিণত হবে এই ভাবনা থেকে চাকরি ছেড়ে আসেন। স্থিত হন চট্টগ্রামের রাংগুনিয়ায়। শুরু করেন এলাকার কৃষকদের সংগঠিত করে বিশাল গুমাই বিলে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ। সেখানকার চাষীদের সাথে ক্ষেতে হাতে কলমে শারীরিকভাবে যুক্ত হয়ে কাজ করেন। এতে চাষীরা তাকে সঙ্গে পেয়ে ‘চাষী’ সাহেব নামে  ডাকতে শুরু করেন। এ থেকেই মাহবুব আলম হয়ে যান মাহবুব আলম চাষী। সমবায় ও নতুন পদ্ধতির চাষাবাদে বিপুল সাফল্য পায়। সে এলাকার কৃষক-স্বনির্ভরতা অর্জনের এক উদাহরণ সৃষ্টি হয় সেখানে। উনসত্তরের নভেম্বরের প্রলয়ংকরী জলোচ্ছাসে লন্ডভন্ড নোয়াখালির রামগতি এলাকায় পুনর্বাসন কাজের পাশাপাশি তিনি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সফল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেন। জনগণকে সংগঠিত করে উৎপাদন বিপ্লব এবং স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব এ ধারণা তার বদ্ধমূল হয়।    
সরকারী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মাহবুব আলম চাষীর সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বরে। তিনি তখন স্বনির্ভর বাংলাদেশ-এর প্রধান সংগঠক। পরিচয়ের মাধ্যম, স্বনির্ভর বাংলাদেশের সমন্বয়কারী এএইচএম নোমান। আমার অফিস থেকে বাহিনীর কর্মকর্তাদের স্বনির্ভর কর্মসূচি বিষয়ের প্রশিক্ষণ সমন্বয়ের জন্য তার সাথে কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল আমাকে। লম্বাদেহী, ফর্সা, চমৎকার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মাহবুব আলম চাষী। নোমান ভাই সহ তার সাথে বসা। প্রথম সভায় তিনি তুলে ধরেছিলেন তার দর্শন-ভাবনা। সেটি ছিল স্বাধীনতার লক্ষ্য-অর্জনে এদেশকে স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ করতে হবে। বিশে^ দেশকে সমৃদ্ধির উচ্চ শিখরে নিয়ে যেতে হবে। নিজস্ব প্রচেষ্টায় গ্রামবাসীদেরই তা করতে হবে। সরকারী সহায়তা হবে তাদের অতিরিক্ত শক্তি। স্বাধীন বাংলাদেশের পথ চলার প্রথম পর্বের এই উন্নয়ন কার্যক্রমের রূপকল্প আমাকে অনুপ্রাণিত করে। এর জন্য এর সাথে যুক্ত হই। অফিসের নির্দেশমত কাজ শুরু করি। নোমান ভাই আমার গাইড। 
মাহবুব আলম চাষীর সাথে আবারো বসতে হয় স্বনির্ভর বাংলাদেশের মতিঝিল অফিসে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ শুরুর প্রস্তুুতি নিয়ে। সেখানে তার নির্দেশনা অনুসারে প্রশিক্ষণ সূচি তৈরি হলো। বাহিনীর মুখপত্র “প্রতিরোধ” এর একটি বিশেষ সংখ্যা বের করার পরিকল্পনা করে তিনি আমাকে বিস্তারিত বুঝালেন। এত বড় একজন মানুষ, এই বিষয়টি আমাকে এমনভাবে বুঝিয়ে দেন যে, আমি অবাক হয়ে যাই। তার পরামর্শ অনুসারে বিশেষ সে সংখ্যাটি একটি চমৎকার প্রশিক্ষণ সহায়ক ডকুমেন্ট হিসেবে প্রকাশিত হয়। আমরা কর্মকর্তারা উপকৃত হয়েছিলাম তাঁর মেধাসমৃদ্ধ প্রকাশনা পেয়ে।
অক্টোবর ১৯৭৯। কিশোরগঞ্জের সদর থানার কাটাবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। বিষয় স্বনির্ভর আন্দোলন ও কার্যক্রম। প্রধান অতিথি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী খোন্দকার আব্দুল হামিদ। মাহবুব আলম চাষী, স্বরাষ্ট্র সচিব মহবুবুজ্জামান, যুগ্ম সচিব মনযূর উল করীম উপস্থিত থেকে প্রশিক্ষণ  উদ্বোধন করেন। মাহবুব আলম চাষী তাঁর স্বভাবসুলভ চমৎকার ভঙ্গিমায় সরল ভাবে স্বনির্ভর আন্দোলনের নানা দিক তুলে ধরেন, সকলকে তা মুগ্ধ করে। তাঁর বক্তব্য গ্রামের সমাজকর্মে নিয়োজিত সকল কর্মকর্তাকে দারুণ অনুপ্রাণিত করে। এর মধ্য দিয়ে সারাদেশে স্বনির্ভর আন্দোলনের কার্যক্রম ছড়িয়ে যায়। ভিত্তি তৈরি হয় গ্রামে গ্রামে। স্বনির্ভর গ্রাম সরকার গঠনের তিনি এ প্রশিক্ষণের সমাপনীর আগের রাতে এই ক্যাম্পে এসেছিলেন। কর্মকর্তাদের সাথে আপন করে কথা বলেন। মাঠের তাবুতে রাত কাটান। সবার জন্য তৈরি শৌচাগার ব্যবহার করেন। তার নিরাপত্তার জন্য থানা থেকে পাঠানো পুলিশ সদস্যদের ‘প্রয়োজন নেই’ বলে ফেরৎ পাঠিয়ে দেন। রাতে সে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল বারী খান এর পক্ষ থেকে সবার জন্য দেয়া চাল ডালের পাতলা খিচুড়ি পরম তৃপ্তি সহকারে থালা চেটে খান তিনি। অসাধারণ জীবন-যাপন। সকল বিবেচনায় অনুসরণীয়।
মাহবুব আলম চাষীর সাথে আবার দেখা হয় গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে কর্মকর্তাদের বিভাগীয় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। রাত কাটান স্থানীয় সাধারণ ডাক বাংলোয়। গভীর রাত পর্যন্ত কর্মীদের সাথে আলোচনা ও কাজের পরিকল্পনা করেন। কর্মীদের কাজ এরকমই। পরদিন প্রশিক্ষণে দীর্ঘ উদ্দীপনামূলক বক্তব্য রাখেন, লক্ষ্য স্বনির্ভর আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রাম পর্যায়ে বাস্তবায়ন এবং সকল গ্রামে ‘গ্রাম সরকার’ গঠন। কর্মকর্তাদের চেতনায় নাড়া দিয়ে তিনি তাদের প্রত্যয়ী করেছিলেন। 
তাঁর সাথে আবারো সাক্ষাৎ হয় টাংগাইলের কালিহাতিতে এক প্রশিক্ষণ কোর্সে। রাত যাপন করেন কালিহাতি আনসার ব্যাটালিয়ন সদরে। সকালে তাকে শেভ করতে দেখি। তিনি বললেন, দেশী বেøড দাড়ি কাটতে চায়না, তাই চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে গেছে। কষ্ট হলেও দেশী বেøড ব্যবহার দেশপ্রেমের অসাধারণ এক নজির। 
উপরোর সবগুলো প্রশিক্ষণ কোর্সই ছিল গ্রামে উন্নয়নমুখী কাজ করতে নিয়োজিত আনসার ভিডিপির কর্মকর্তাদের জন্য। প্রশিক্ষণের তাদের প্রচেষ্টায় সারাদেশে বিপুল আলোড়ন তুলেছিল স্বনির্ভর আন্দোলন। তাদের প্রচেষ্টায় গ্রামে গ্রামে গঠন হয় “গ্রাম সরকার”। কাজ শুরু হয় উৎপাদন বৃদ্ধি, নিরক্ষরতা দূরকরণ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও শান্তি রক্ষায়। নতুন এ কর্মসূচিতে আসে বিপুল সফলতা। দেশকে করার এ আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে সফল হন মাহবুব আলম চাষী।
অত্যন্ত সাদা-মাটা মানুষটি ছিলেন অসাধারণ। পোশাক খদ্ধরের পাঞ্জাবী, পায়জামা, পায়ে সেন্ডেল, কাধে চটের ব্যাগ। সাধারণ খাবার, সাধারণ জীবন যাপন। তবে স্বনির্ভর আন্দোলনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ। সব সময় কর্মীদের সাথে পরামর্শ করে কাজে এগুতেন, সিদ্ধান্ত নিলে কঠোর ছিলেন বাস্তবায়নে। সব সময় কর্মীদের প্রশংসা ও উৎসাহে উজ্জীবিত রাখতেন। ব্যতিক্রমে কঠোর হতেও দেখেছি। তিনি সবাইকে কাজে লাগানোর অসাধারণ দক্ষতা রাখতেন। অন্যদের উদ্বুদ্ধ করারও ক্ষমতা ছিল তার। নিজে বিরামহীন কাজ করতেন। তবে প্রশংসা ও কৃতিত্ব দিতেন কর্মীদের। বলতেন এ কর্মী ও কর্মী এসব কাজ করেছে। 
প্রচন্ড আত্মবিশ^াস ও আন্তরিকতা নিয়ে দেশের সকল গ্রামে ‘গ্রাম সরকার’ গঠনের নিরলস প্রচেষ্টা ছিল তাঁর। সভা সমাবেশ কর্মশালা এসব করে বিবর্তিত এই ধারণার প্রসার ও বাস্তবায়ন ঘটান। সরকারের সংশ্লিষ্টদের বিশেষ করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে গ্রাম সরকার ধারণা, এর বাস্তবায়নের ইতিবাচক ফলাফল বুঝাতে পেরেছিলেন। ফলে সরকার ১৯৮০-সালে সারাদেশে সরকারীভাবে আইনের মাধ্যমে “স্বনির্ভর গ্রাম সরকার” গঠন করে। গ্রামোন্নয়নে অসাধারণ সফলতা ও বিপ্লবের সূচনা করে স্বনির্ভর গ্রাম সরকার। মাত্র দু’বছরে গ্রামে উন্নয়নের আলোড়ন আসে। নতুন নেতৃত্ব ও কর্মী তৈরী হয়। সার্বিক উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি ও শান্তি রক্ষায় বিরাট সফলতা এনেছিল। সম্ভাবনাসমৃদ্ধ এই বৈপ্লবিক কার্যক্রম ১৯৮২ সালে বাতিল করে দেন সামরিক শাসক  এইচ এম এরশাদ। 
স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন পররাষ্ট্র সচিব সাহসী মুক্তিযোদ্ধা দেশে গণতন্ত্রের পরিবর্তে সামরিক শাসন, চলমান উন্নয়ন কর্মসূচি বিশেষ করে স্বনির্ভর গ্রাম সরকার স্থগিত হয়ে গেলে হতাশ হন। ফিরে যান চট্টগ্রামের রাংগুনিয়ার কৃষি খামারে। সেখানে নিজে কৃষি কাজ ও মুরগী পালন করে নতুন জীবন শুরু করেন। স্বনির্ভর মাহবুব আলম চাষী।
মাহবুব আলম চাষী সড়কপথে হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদী আরব যাচ্ছিলেন। রাস্তায় গাড়ী দুর্ঘটনায় ১৯৮৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। আজ তার ৪৩তম মৃত্যু বার্ষিকী। 
মাহবুব আলম চাষীর জন্ম চট্টগ্রামে ১লা অক্টোবর ১৯২৭ সালে। সফল এক উন্নয়ন আন্দোলনের পথিকৃৎ এখন  চিরনিন্দ্রায় শায়িত গ্রামীণ কাজের সূচনা এলাকা চট্টগ্রামের রাংগুনিয়ার চাষী ফার্মের উঁচু টিলায়। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন।

লেখকঃ অবসরপ্রাপ্ত গণসংযোগ কর্মকর্তা,বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি,