প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অপচেষ্টা রুখতে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকুন

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৬-০৯-০৩ ২৩:২১:৪১
image

সমাজবিরোধী অপশক্তি যাতে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং দেশের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কেউ যাতে বিনষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে দেশবাসীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পুরোহিত ও সেবাইতদের সম্মানী প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানের শুরুতে গীতা পাঠ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আবহমানকাল থেকেই দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করে আসছে। তবে বিভিন্ন সময়ে কংস চরিত্রের মানুষেরা রাষ্ট্র ও সমাজে বিভেদ তৈরির অপচেষ্টা চালিয়েছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় গণতন্ত্রকামী মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে একটি নিষ্ঠুর শাসন জনগণের ওপর চেপে বসেছিল। পরে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ হাজারো প্রাণের বিনিময়ে সেই ফ্যাসিস্ট শক্তির পতন ঘটিয়েছে। বাংলাদেশে আবার গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। এখন ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির মাধ্যমে দেশ পুনর্গঠনের পালা।
বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের সম্মিলনকে বৈচিত্র্যময় সমাজের সৌন্দর্য হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় মানুষকে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু পরিচয়ে বিভক্ত করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। দেশের বাইরে গেলে পরিচয়ের এই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই বিভেদ নয়, সব নাগরিককে বাংলাদেশি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজে দল, মত, ধর্ম, বর্ণ কিংবা অন্য কোনো পরিচয় যেন মানুষের মধ্যে বৈষম্য ও বিভেদের কারণ না হয়, সেই উপলব্ধি থেকেই স্বাধীনতার ঘোষকের রাজনৈতিক দর্শন ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’। দেশের সব নাগরিকের গর্বিত পরিচয় ‘আমরা বাংলাদেশী’।
কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সরকারের লক্ষ্য তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্র তার সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। একইভাবে নাগরিকদেরও রাষ্ট্রের প্রতি নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। পারস্পরিক দায়িত্ব, আস্থা ও আলোচনার মধ্য দিয়েই সবার প্রত্যাশিত কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে। সমাজে কেউ যাতে পিছিয়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, সার্বভৌমত্ব সুসংহত রেখে সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি। এ লক্ষ্যেই সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী ভাতাসহ নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
শ্রীকৃষ্ণের জন্মকাহিনি স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রমতে কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মথুরায় শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। সে সময় মথুরার শাসক ছিলেন অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী কংস। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের পর কংসের পতন ঘটে। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন ছিল শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম ব্রত বলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দেশ সবার। নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের অধিকার সমান এবং নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। বর্তমান সরকার ও বিএনপি বিশ্বাস করে, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’।
তিনি আরও বলেন, ‘ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার।’ তাই ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও শক্তিশালী করতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
আসন্ন দুর্গাপূজার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে সব ধর্মীয় আয়োজন পালনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছার পাশাপাশি আগাম দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে পুষ্পস্তবক উপহার দেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষে তা গ্রহণ করেন সংসদ সদস্য সুবর্ণা শিকদার ঠাকুর।
এ সময় মন্দিরের নয়জন পুরোহিত ও সেবাইতের মধ্যে সম্মানী বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত পুরোহিত ও সেবাইতদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, ধর্ম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার, পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, স্বামীবাগ ইসকনের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী মহারাজ এবং বিএনপির সহধর্ম বিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু।

জন্মাষ্টমী, সম্প্রীতি, নিরাপত্তা