বন্ধুরা,আজ আগের পর্বের ধারাবাহিকতা রেখেই এবার মানচিত্রটি মানুষের কাছে পৌঁছাবে। তোমাদের বয়স ও বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে কোনো অসম্ভব অভিযান নয়-তোমাদের পর্যবেক্ষণ, যুক্তি, সাহস এবং পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধই থাকবে গল্পের মূল শক্তি।
রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'হারানো জলধারার খোঁজে'
পর্ব-৭০:
বটবনের পাঠশালার সামনে আজ বেশ ভিড়।
দেয়ালে টাঙানো হয়েছে রাহি,অরণ ও শিসুর তৈরি করা বড় মানচিত্র।
মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে-
পুরোনো পুকুর,
শুকনো নালা,
বৃষ্টির পানি জমার জায়গা
এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহের পথ।
রাহি গ্রামের মানুষদের বলল,
-'আমরা কাউকে বলতে আসিনি যে আপনারা ভুল করছেন। আমরা শুধু দেখাতে চাই,বৃষ্টির পানি এখন কোথায় আটকে যাচ্ছে।'
অরণ মানচিত্রের একটি জায়গা দেখিয়ে বলল,
-'এখানে আমরা বৃষ্টির পর পানি জমতে দেখেছি। আর এখান দিয়ে পানি ধীরে ধীরে পুকুরের দিকে গেছে।'
একজন চাচা বললেন,
-'কিন্তু এই নালাটা তো অনেক পুরোনো। এতে কী এমন সমস্যা হবে?'
অরণ শান্তভাবে বলল,
-'সমস্যা নালাটা পুরোনো বলে নয়। সমস্যা হলো,নালার কয়েকটি জায়গা মাটি আর আবর্জনায় বন্ধ হয়ে গেছে।'
নাসির স্যার বললেন,
-'ওরা কয়েক দিন ধরে জায়গাগুলো পর্যবেক্ষণ করেছে। তবে কোনো পরিবর্তনের কাজ নিজেরা করবে না। আগে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের জানানো হবে।'
কথাটা সবাই মন দিয়ে শুনল।
এরপর হাবিবুর চাচা বললেন,
-'তোমরা ছোট হলেও একটা ভালো কাজ করেছ। আমরা অনেক কিছু চোখের সামনে দেখেও গুরুত্ব দিইনি।'
শিসু একটু গর্ব করে বলল,
-'আমরা কিন্তু সব জানি না!'
সবাই হেসে উঠল।
শিসু আবার বলল,
-'তাই তো বড়দের কাছেও জিজ্ঞেস করেছি।'
রাহি বলল,
-'আমাদের মানচিত্রটা আসলে সবার। কেউ কোথায় কী দেখেছেন,সেটাও আমরা এতে যোগ করেছি।'
একজন কৃষক সামনে এসে বললেন,
-'আমার জমির পাশের নালাটাও দেখে দেবে? বর্ষায় সেখানে পানি আটকে থাকে।'
রাহি সঙ্গে সঙ্গে খাতা খুলল।
-'অবশ্যই। তবে আগে দেখে বুঝতে হবে।'
সেদিন আরও কয়েকজন নিজেদের এলাকার সমস্যার কথা জানালেন।
কোথাও নালা ময়লায় বন্ধ।
কোথাও পুকুরের পাড় ভেঙেছে।
কোথাও বৃষ্টির পানি বের হওয়ার পথ সরু হয়ে গেছে।
রাহি সব লিখে রাখল।
দিনের শেষে অরণ বলল,
-'আমাদের মানচিত্র তো আর শুধু পুরোনো জলধারার মানচিত্র নেই।'
রাহি হেসে বলল,
-'এখন এটা আমাদের গ্রামের সবুজ ও জলপথের মানচিত্র।'
শিসু বলল,
-'আর এর কাজও শেষ হয়নি।'
রাহি মাথা নেড়ে বলল,
-'ঠিক। এবার আমাদের তথ্যগুলো ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে হবে।'
নাসির স্যার বললেন,
-'এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যা খুঁজে বের করা সহজ। সমাধানের জন্য সঠিক মানুষকে যুক্ত করাই আসল কাজ।'
সন্ধ্যায় সবাই চলে যাওয়ার পর তিন বন্ধু মানচিত্রটির সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
রাহি বলল,
-'আমরা কি সত্যিই একটা পরিবর্তন আনতে পারব?'
অরণ বলল,
-'হয়তো পুরো গ্রাম একদিনে বদলাবে না।'
শিসু যোগ করল,
-'কিন্তু একটা মানুষ যদি আজ থেকে নালায় ময়লা না ফেলে?'
রাহি মৃদু হেসে বলল,
-'তাহলেই তো শুরু।'
বটগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে তখন শেষ বিকেলের আলো এসে মানচিত্রের ওপর পড়ছে।
নীল রেখাগুলো যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
রাহি ডায়েরিতে লিখল-
'বড় কাজ সবসময় বড় কিছু দিয়ে শুরু হয় না। কখনো একটি খাতা,একটি মানচিত্র আর তিনটি শিশুর প্রশ্ন দিয়েও শুরু হতে পারে।'
তারপর খাতা বন্ধ করে সে বলল,
-'চলো, কাল থেকে নতুন কাজ।'
শিসু জিজ্ঞেস করল,
-'কী কাজ?'
রাহি উত্তর দিল,
-'আমাদের গ্রামের গাছগুলোকে গুনব।'
অরণ অবাক।
-'গাছ গুনব? কেন?'
রাহি হাসল।
-'কারণ জলপথের পর এবার জানতে হবে-আমাদের সবুজ কতটা আছে।'
তিনজন বটগাছের দিকে তাকাল।
নতুন অভিযানের প্রথম সাক্ষী যেন সেই বিশাল বটদাদুই।
পরের পর্বে শুরু হবে একেবারে নতুন,বাস্তব ও আনন্দময় কাজ।'গাছ গোনার দিন'।
রাহি,অরণ ও শিসু গ্রামের 'বড় গাছগুলোর একটি তালিকা তৈরি করবে'-কোন গাছ কোথায়,কী ধরনের গাছ,কে দেখাশোনা করে এবং কোন গাছগুলো বিপদের মুখে।
কিন্তু গাছ গুনতে গিয়ে তারা এমন একটি বিষয় আবিষ্কার করবে,যা তাদের ভাবিয়ে তুলবে-
'গ্রামে গাছের সংখ্যা শুধু কমছে না,কিছু পুরোনো গাছের পরিচয়ও হারিয়ে যাচ্ছে।'
সেখান থেকেই শুরু হবে 'গাছের পরিচয় খোঁজার' নতুন অভিযান।