ক্ষমতাবান হলেও গুমের অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৬-০৮-৩১ ১১:১০:১৯
image

গুমের ঘটনায় জড়িত অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, তাকে বিচারের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না এবং গুমের সঙ্গে জড়িতদের আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
রোববার সকাল ১১টায় রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো মা যেন সন্তানের জন্য কিংবা কোনো স্ত্রী যেন স্বামীর জন্য অনিশ্চয়তা ও কষ্টের অশ্রু না ফেলেন—এমন বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
বিগত দেড় দশকের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, সে সময় অন্যায়ের প্রতিবাদ, ভিন্নমত প্রকাশ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিদের তুলে নিয়ে গুম-খুন করা হয়েছে। গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। এসব গুরুতর অপরাধের বিষয় রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অস্বীকার করলেও তা মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ওই শাসনব্যবস্থার পতন ঘটেছে। এখন প্রতিশোধের পরিবর্তে প্রতিকারের পথে এগোতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
গুমের ভয়াবহতা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি মানুষকে নিখোঁজ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুধু তার জীবনই কেড়ে নেওয়া হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো পরিবার। স্বজনেরা হারান শান্তি, স্বপ্ন ও সামাজিক-অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। তাঁর মতে, গুম একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং এর মাধ্যমে নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনি সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়।
দেশে গুম-খুনের মাধ্যমে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেটিকে জাতীয় ইতিহাসের বেদনাদায়ক ও অপমানজনক অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। এ সময় তিনি ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ গুমের শিকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা স্মরণ করেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, গুম-খুন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। একদিন এসব অপরাধের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে—এমন বিশ্বাস তিনি ধারণ করতেন।
এ সময় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের কথাও স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। গুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা সানজিদা ইসলাম তুলির প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। গুমের শিকার পরিবারগুলোর মর্যাদা রক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ দেওয়া, জীবিকার ব্যবস্থা এবং পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের পরিবেশ থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা বজায় থাকবে, তবে আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, একটি দেশের সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। দেশটি কতটা গণতান্ত্রিক, কল্যাণমুখী, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং নাগরিকেরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারছেন-তার ওপরই প্রকৃত উন্নয়ন ও সাফল্যের চিত্র নির্ভর করে। এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারের কথাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য দেন। তাঁরা গুমের ঘটনাগুলোর যথাযথ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

গুম, আয়নাঘর, বিচার