ঠাকুরতলায় সিএনজি থেকে ব্যাগভর্তি অস্ত্র ও তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার,আটক ২,নেপথ্যে কারা অস্ত্রের উৎস!

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৮-৩০ ১০:৫২:০১
image

মহেশখালী (কক্সবাজার) 
মহেশখালীতে ফের অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শনিবার (২৯ আগস্ট) রাতে উপজেলার ছোট মহেশখালীর ঠাকুরতলা এলাকায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে ব্যাগভর্তি অস্ত্র ও অস্ত্র তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করেছে পুলিশ।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, রাতে ঠাকুরতলা এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাটিতে তল্লাশি চালানোর সময় একটি ব্যাগের ভেতর অস্ত্র ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম পাওয়া যায়। পরে ওই সিএনজিতে থাকা দুজনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও সরঞ্জামের প্রকৃতি, সংখ্যা এবং এগুলো কোথা থেকে আনা হয়েছিল এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।

কয়েক দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় ঘটনা
ঠাকুরতলার সর্বশেষ ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে এলো, যখন মাত্র কয়েক দিন আগে মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের মিঠাছড়ি এলাকায় পুলিশের অভিযানে কথিত দেশীয় অস্ত্র তৈরির একটি আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায়।
২১ আগস্ট রাতে ওই অভিযানে রহমত উল্লাহ ওরফে বাশি নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। পুলিশের দাবি, তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাহাড়ের ভেতরের একটি ভাড়া করা ঘর থেকে বন্দুকের কাঠের বাট, ট্রিগার ম্যাকানিজম, ব্যারেলের অংশ, ট্রিগার, স্প্রিংসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে এবং আরও কয়েকজনকে শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
ফলে মাত্র আট দিনের ব্যবধানে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের সঙ্গে নতুন করে অস্ত্রসহ দুজন আটকের ঘটনায় মহেশখালীতে অস্ত্রের উৎস, উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

অস্ত্রের উৎস কোথায়?
ঠাকুরতলায় উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলো কোথা থেকে এসেছে এখন সেটিই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এগুলো মহেশখালীর কোনো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তৈরি হয়েছে, নাকি অন্য কোনো এলাকা থেকে আনা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তদন্ত প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, সাধারণভাবে তৈরি অস্ত্র পরিবহনের সঙ্গে অস্ত্র তৈরির যন্ত্রপাতি একসঙ্গে পাওয়া গেলে এর পেছনে কোনো উৎপাদন বা সরবরাহচক্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

কার কাছে যাচ্ছিল এসব অস্ত্র?
আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ এখন জানার চেষ্টা করছে ব্যাগভর্তি অস্ত্রের সম্ভাব্য গন্তব্য কোথায় ছিল এবং কার কাছে এগুলো পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল।
অস্ত্রগুলো কোনো ব্যক্তি, অপরাধীচক্র কিংবা স্থানীয় কোনো সংঘবদ্ধ গ্রুপের কাছে সরবরাহের জন্য নেওয়া হচ্ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়টিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মিঠাছড়ির ঘটনায় যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছিল
২১ আগস্ট মিঠাছড়ির ঘটনায় পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পাহাড়ের ভেতরের একটি ভাড়া ঘরে অস্ত্র তৈরির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম মজুত রাখা হয়েছিল। পুলিশের দাবি ছিল, আটক ব্যক্তি ও তার সহযোগীরা লোকচক্ষুর আড়ালে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেগুলো বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হতো।
সেই ঘটনার তদন্তের মধ্যেই ঠাকুরতলায় অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসায় তদন্তকারীদের সামনে স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে দুই ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামের উৎস একই কি না এবং মহেশখালীর দুর্গম এলাকাগুলোতে আরও কোনো গোপন অস্ত্র তৈরির আস্তানা রয়েছে কি না।
তবে দুটি ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে—এমন কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তদন্তের মাধ্যমেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

দুর্গম পাহাড় ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
মহেশখালীর বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। অতীতেও এসব এলাকায় দেশীয় অস্ত্র তৈরির কারখানা উদ্ধারের নজির রয়েছে। কয়েক বছর আগে মহেশখালীর পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে একাধিক অস্ত্র তৈরির কারখানা, তৈরি অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল।
এ কারণে বর্তমান ঘটনায় শুধু আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করাই নয়, অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য উৎসস্থল, কাঁচামাল সংগ্রহ, পরিবহনপথ এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ
ঠাকুরতলার ঘটনায় আটক দুজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অস্ত্রের উৎস ও সম্ভাব্য সহযোগীদের শনাক্ত করা এখন পুলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি উদ্ধার করা অস্ত্র ও সরঞ্জামের ফরেনসিক বা কারিগরি পরীক্ষা হলে এগুলোর ব্যবহার ও সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে অস্ত্রগুলো কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে তৈরি বা সরবরাহ করা হচ্ছিল, তাহলে শুধু বাহক নয় এর পেছনের মূল হোতাদের শনাক্ত করাই হবে তদন্তের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

স্থানীয়দের উদ্বেগ
একই এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও প্রত্যন্ত জনপদে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অস্ত্রের উৎসস্থল চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে তা বন্ধ করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অস্ত্রের পাশাপাশি মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধেও সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ঠাকুরতলায় সিএনজি থেকে ব্যাগভর্তি অস্ত্র ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে একটি বিচ্ছিন্ন অভিযান হলেও এর সঙ্গে সাম্প্রতিক মিঠাছড়ির অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনা মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে অস্ত্রের উৎস, তৈরির স্থান, সরবরাহকারী এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের শনাক্ত করা গেলে মহেশখালীতে সক্রিয় কোনো অস্ত্রচক্রের অস্তিত্ব থাকলে সেটি উদ্ঘাটনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এখন দেখার বিষয় ঠাকুরতলায় আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ কতটা তথ্য বের করতে পারে এবং ব্যাগভর্তি অস্ত্রের নেপথ্যে থাকা মূল চক্রের কাছে তদন্ত কতদূর পৌঁছায়।