'মানচিত্রে হারানো নীল রেখা'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৮-২৮ ১৭:১৮:৫০
image

বন্ধুরা,গত পর্বে যে পুরোনো নকশায় নীল রেখাটি হঠাৎ থেমে গিয়েছিল,আজ রাহি,অরণ ও শিসু সেই জায়গাটিই খুঁজতে বের হবে। রহস্য থাকবে,কিন্তু আজকের মধ্যেই তারা বুঝতে পারবে নীল রেখাটির আসল অর্থ কী। আর এখান থেকেই গল্পের পরবর্তী বড় অধ্যায়ের দরজা খুলবে।

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'হারানো জলধারার খোঁজে'
পর্ব-৬৬: 

রাহির খাতার ওপর বড় একটি কাগজ বিছানো।
কাগজের এক পাশে পুরোনো নকশা।
অন্য পাশে তারা নিজেরা আঁকা নতুন মানচিত্র।
অরণ হাতে পেন্সিল নিয়ে দুই মানচিত্র মিলিয়ে দেখছে।

শিসু পাশে বসে বারবার বলছে,
-'এখানে তো নালা আছে।'
-'হ্যাঁ।'
-'এখানেও পুকুর।'
-'হ্যাঁ।'
-'তাহলে এই নীল রেখাটা এখানে এসে শেষ হলো কেন?'

অরণ এবার চুপ করে গেল।
রাহি পুরোনো নকশার দিকে তাকাল।
সত্যিই।
একটি সরু নীল রেখা বাঁশবন পেরিয়ে পুকুরের কাছে এসেছে।
তারপর আরও একটু এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেছে।

কোথাও কোনো নাম নেই।
কোনো চিহ্ন নেই।
শুধু একটি ছোট গোল দাগ।
তার পাশে লেখা-
'শুকনো মৌসুমেও পথ থাকে।'

শিসু চোখ বড় বড় করে বলল,
-'পথ থাকে,কিন্তু পানি নেই?'

নাসির স্যার বললেন,
-'হতে পারে পুরোনো কোনো জলধারা। তবে অনুমান করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।'

রাহি বলল,
-'তাহলে খুঁজে দেখি।'

পরদিন সকালেই তারা বেরিয়ে পড়ল।
সঙ্গে নাসির স্যার,হাবিবুর চাচা এবং গ্রামের আরও দুজন।
পুরোনো মানচিত্রে যে জায়গায় নীল রেখাটি শেষ হয়েছে,সেখানে এখন একটি বড় খোলা মাঠ।
মাঠের এক পাশে কয়েকটি গাছ।
অন্য পাশে ঘাসে ঢাকা নিচু জমি।
অরণ চারদিকে তাকিয়ে বলল,
-'এখানে তো কোনো জলধারা নেই!'

হাবিবুর চাচা মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন,
-'অনেক বছর আগে এখানে বর্ষায় পানি জমত।'

রাহি অবাক হয়ে বলল,
-'এখন জমে না কেন?'

চাচা উত্তর দেওয়ার আগেই শিসু মাটিতে বসে পড়ল।
-'এখানে দেখো!'

ঘাস সরিয়ে দেখা গেল মাটির নিচে শক্ত ইটের সারি।
একটি সরু রেখার মতো।
অরণ উত্তেজিত হয়ে বলল,
-'এটাই কি সেই পথ?'

নাসির স্যার সাবধানে মাটি পরীক্ষা করলেন।
-'সম্ভবত পুরোনো নালার কিনারা।'

তারা একটু দূর এগিয়ে গেল।
ইটের রেখাটিও এগিয়ে গেছে।
কিন্তু মাঝখানে এসে হঠাৎ হারিয়ে গেছে।
সেখানে মাটি অনেক উঁচু।

রাহি বলল,
-'এখানে নিশ্চয়ই পরে মাটি ফেলা হয়েছে।'

হাবিবুর চাচা মাথা নেড়ে বললেন,
-'হ্যাঁ। বহু বছর আগে মাঠটা সমান করার জন্য এখানে মাটি ফেলা হয়েছিল।'

শিসু বলল,
-'তাহলে পানির পথ বন্ধ হয়ে গেছে!'

স্যার বললেন,
-'সম্ভবত। তবে সেটা খুলে দেওয়া যাবে কি না,তা বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।'

অরণ বলল,
-'আমরা অন্তত মানুষকে জানাতে পারি।'

রাহি বলল,
-'শুধু জানালে হবে না। তথ্যও দিতে হবে। কোথায় ছিল,কীভাবে বন্ধ হয়েছে-সব লিখে রাখতে হবে।'

তিনজন কাজ শুরু করল।
মাপ নিল।
ছবি তুলল।
মানচিত্রে বর্তমান অবস্থান চিহ্নিত করল।
কোথায় পানি জমে,কোথায় জমে না-সব লিখে রাখল।

হঠাৎ শিসু দূরে দৌড়ে গেল।
-'এদিকে এসো!'

সবাই সেখানে গেল।
একটি পুরোনো পাথরের ফলক অর্ধেক মাটির নিচে।
মাটি পরিষ্কার করতেই লেখা দেখা গেল-
'জলকে পথ দাও।'
তার নিচে একটি তীর।
তীরটি মাঠের উঁচু অংশের দিকে।

অরণ বলল,
-'এটা তো রহমান মাস্টারের কথার মতো!'

হাবিবুর চাচা চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
-'হয়তো তিনি শুধু পাঠশালা চালাতেন না। গ্রামের জলপথ নিয়েও ভাবতেন।'

রাহি ফলকটির দিকে তাকিয়ে বলল,
-'তাহলে তাঁর রেখে যাওয়া কাজগুলো আলাদা আলাদা নয়।'

নাসির স্যার বললেন,
-'ঠিক ধরেছ। বটগাছ,পুকুর,নালা,জলধারা-সবকিছু একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত।'

তখনই অরণ পুরোনো নকশাটা বের করল।
সে মাঠের দিকে তাকিয়ে বলল,
-'রাহি,নীল রেখাটা যদি এখান দিয়ে গিয়ে থাকে,তাহলে এর পরের জায়গাটা কোথায়?'

রাহি মানচিত্রে আঙুল চালাল।
নীল রেখাটি মাঠ পেরিয়ে আরও দূরে গেছে।
সেখানে লেখা-
'বনের প্রান্ত।'
শিসু বলল,
'আবার বন!'

রাহি হেসে বলল,
-'তবে এবার আমরা জানি,কী খুঁজছি।'

সন্ধ্যার আগে তারা ফিরে এল।
কিন্তু ফেরার সময় রাহি মাঠটার দিকে শেষবার তাকাল।
শুকনো ঘাসের নিচে চাপা পড়ে আছে একটি পুরোনো জলপথ।
একসময় যার ওপর নির্ভর করত একটি পুরো এলাকার প্রকৃতি।
আজ সেটি মানুষের চোখের আড়ালে।
রাহি ডায়েরিতে লিখল,
-'জলধারা শুকিয়ে গেলেই তার পথ মুছে যায় না। কখনো কখনো পথটি মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকে।'

তারপর একটু ভেবে লিখল,
-'প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে শুধু যা দেখা যায়, তা নয়-যা হারিয়ে গেছে,তার চিহ্নও খুঁজে দেখতে হয়।'

শিসু তখন পাশে বসে বাঁশিতে মৃদু সুর তুলছিল।
অরণ মানচিত্র গুছিয়ে বলল,
-'আগামীকাল বনের প্রান্ত।'

রাহি মাথা নেড়ে বলল,
-'হ্যাঁ। তবে এবার আমরা শুধু তিনজন নই।'

শিসু অবাক হয়ে বলল,
-'তাহলে?'

রাহি হাসল।
-'এই পথের গল্পটা পুরো গ্রামের।'

আজকের সবুজ শিক্ষাঃ
প্রকৃতির জলপথ অনেক সময় মানুষের তৈরি পরিবর্তনের কারণে হারিয়ে যেতে পারে। কোনো জলপথের ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা জানা থাকলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত সমস্যার সমাধানে তা কাজে লাগতে পারে।

আজকের ছোট্ট তথ্যঃ
বর্ষার পানি অনেক সময় প্রাকৃতিক নিচু জমি,নালা ও জলাধারের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়। এসব স্বাভাবিক প্রবাহপথ বন্ধ হলে পানি অন্য জায়গায় জমে যেতে পারে।

বন্ধুরা, পুরোনো মানচিত্রের নীল রেখা এবার পৌঁছাবে বনের প্রান্তে।
সেখানে রাহিরা দেখতে পাবে কয়েকটি পুরোনো পাথর পাশাপাশি বসানো। প্রতিটি পাথরে আলাদা আলাদা চিহ্ন।
কেউ জানে না,এগুলোর অর্থ কী।
কিন্তু হাবিবুর চাচা একটি চিহ্ন দেখেই হঠাৎ বলবেন-
'এই চিহ্ন আমি ছোটবেলায়ও দেখেছি...'
আর সেই স্মৃতিই রাহিদের সামনে খুলে দেবে 'হারিয়ে যাওয়া জলধারার শেষ অংশের ইতিহাস।'