নবীজীর জীবনাদর্শ স্মরণের মধ্য দিয়ে দেশে পালিত হচ্ছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
  • ২০২৬-০৮-২৬ ১৪:১৭:৪৬
image

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত ১২ রবিউল আউয়াল আজ। মহানবী (সা.)-এর পবিত্র জীবন, অনন্য চরিত্র, মানবিক শিক্ষা ও শান্তির আদর্শ স্মরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পালিত হচ্ছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)।
বাংলাদেশে দিনটি যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ছুটি রয়েছে। দেশের বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ পাঠ, দোয়া, ওয়াজ-মাহফিল, আলোচনা সভা ও অন্যান্য ধর্মীয় কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ স্মরণ করে নফল ইবাদত, দান-খয়রাতসহ বিভিন্ন আমল করছেন। 
ইসলামের সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কার কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের আগেই তিনি পিতা আবদুল্লাহকে হারান এবং ছয় বছর বয়সে মাতাকেও হারিয়ে এতিম অবস্থায় বেড়ে ওঠেন। প্রতিকূল শৈশবের মধ্যেও তাঁর চরিত্রে ফুটে ওঠে সততা, আমানতদারি, সংযম, দয়া ও উত্তম নৈতিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত। এ কারণেই মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ অর্থাৎ বিশ্বস্ত ও আমানতদার হিসেবে অভিহিত করত। 
মহানবী (সা.) এমন এক সময়ে পৃথিবীতে আগমন করেন, যখন আরব সমাজ পৌত্তলিকতা, কুসংস্কার, গোত্রীয় সংঘাত, হিংসা, বৈষম্য ও নানা ধরনের সামাজিক অনাচারে জর্জরিত ছিল। এই বাস্তবতার মধ্যে তাঁর নবুয়ত মানবসমাজে ন্যায়, সত্য, তাওহিদ, দয়া, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
চল্লিশ বছর বয়সে মক্কার হেরা গুহায় তাঁর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নবুয়তের মহান দায়িত্ব। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানান এবং মিথ্যা, জুলুম, শোষণ, প্রতারণা ও অন্যায় থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেন। একই সঙ্গে এতিম, দরিদ্র, অসহায়, নারী, শিশু ও সমাজের দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মক্কার জীবনে মহানবী (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের কঠিন নির্যাতন ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। পরে আল্লাহর নির্দেশে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। সেখানে তিনি পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, ন্যায়বিচার, সহাবস্থান ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে সমাজ গঠনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
প্রায় ২৩ বছর নবুয়তের দায়িত্ব পালন করে তিনি মানুষকে সত্য ও কল্যাণের পথে আহ্বান করেন। তাঁর জীবনের বিভিন্ন ঘটনায় ক্ষমাশীলতা, সহিষ্ণুতা, দয়া ও মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। মক্কা বিজয়ের পর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁর ক্ষমাশীলতার দৃষ্টান্ত মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায়, সততা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, প্রতিবেশীর অধিকার এবং দুর্বল মানুষের প্রতি সহমর্মিতার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণ করেই শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হচ্ছে আজও।
৬৩ বছর বয়সে মদিনায় মহানবী (সা.) ইন্তেকাল করেন। তাঁর ওফাত মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর শোকের ঘটনা হয়ে আসে। তাঁর সাহাবিরা প্রিয় নবীর বিদায়ে শোকাহত হলেও তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও শিক্ষা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথনির্দেশ হয়ে থাকে।

রাষ্ট্রপতির বাণী
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পৃথক বাণী দিয়েছেন। তিনি মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান বিশ্ব যখন যুদ্ধ, সংঘাত, হিংসা, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতায় বিপর্যস্ত, তখন মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় পরিহার করে শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিকতার ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। ([Prothom Alo][3])

প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বাণী দিয়েছেন। মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহমর্মিতা, ক্ষমা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ অনুসরণ করে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। এতিম, দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল ও সহমর্মী হওয়ার পাশাপাশি পরিবার, প্রতিবেশী, নারী, শিশু এবং সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষার শিক্ষাও তিনি দিয়েছেন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষকালব্যাপী আয়োজন
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এসব আয়োজনের মধ্যে রয়েছে মাহফিল, সম্মেলন, সেমিনার, কবিতা পাঠ, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, প্রকাশনা ও প্রদর্শনী। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব ও দক্ষিণ চত্বরে ইসলামি বইমেলারও আয়োজন করা হয়েছে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন মসজিদ, ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় সংগঠনের উদ্যোগে মহানবী (সা.)-এর জীবন, কর্ম, চরিত্র ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে সত্য, ন্যায়, সততা, সহমর্মিতা, ক্ষমা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন। তাঁর আদর্শ অনুসরণের মধ্য দিয়ে হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভেদমুক্ত শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশাই আজকের দিনের অন্যতম মূল বার্তা।

ঈদে মিলাদুন্নবী, মহানবী, মানবিকতা