'শুকনো নালার গোপন সিঁড়ি'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৮-২৪ ১০:১৯:২৬
image

বন্ধুরা,গত পর্বে রাহি, অরণ ও শিসুকে নিয়ে এসেছিল শুকনো নালার কাছে। আজ সেই রহস্যের দরজা খুলবে।
 
রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'বাঁশবনের ওপারে'
পর্ব-৬২: 

পরদিন সকালেই রাহি, অরণ আর শিসু হাজির হলো শুকনো নালার পাশে।

সঙ্গে নাসির স্যার এবং গ্রামের আরও দুজন বড় মানুষ।
গত দিনের সেই কাঠের ফলকটিও তারা সঙ্গে এনেছে।

শিসু উত্তেজনায় বলল,
-'আজ কিন্তু রহস্যের সমাধান করতেই হবে!'

অরণ হেসে বলল,
-'আগে সিঁড়ি খুঁজে বের করো।'

রাহি চুপচাপ চারপাশ দেখছিল।
শুকনো নালার দুপাশে কাশবন।
কোথাও ছোট ঝোপ।
কোথাও পুরোনো গাছের শিকড়।

হঠাৎ গ্রামের রহিম চাচা বললেন,
-'এই জায়গাটাকে আমার খুব চেনা মনে হচ্ছে।'

তিনি নালার বাঁ পাশে গিয়ে শুকনো ঘাস সরালেন।
তারপর-
-'এই যে!'

মাটির নিচে দেখা গেল একটি ইট।
তার পাশে আরেকটি।
তারপর আরেকটি।

অরণ হাঁটু গেড়ে বসে বলল,
-'এগুলো তো ধাপের মতো!'

ধীরে ধীরে মাটি ও শুকনো পাতা সরাতেই বেরিয়ে এলো কয়েকটি পুরোনো ইটের সিঁড়ি।
সিঁড়িগুলো নেমে গেছে নালার নিচের দিকে।
শিসুর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
-'এখানে সত্যিই কেউ যাতায়াত করত!'

নাসির স্যার সাবধান করে বললেন,
-'কেউ নিচে নামবে না। আগে জায়গাটা নিরাপদ কি না জানতে হবে।'

সবাই সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকাল।
নিচে অন্ধকার।
তবে একটু পর রাহি দেখতে পেল, নিচে আরেকটি সরু পথ বেরিয়ে গেছে।
সেটি গিয়ে মিশেছে একটি পুরোনো পুকুরের দিকে।

রহিম চাচা হঠাৎ বললেন,
-'আরে!'

সবাই তার দিকে তাকাল।
তিনি বললেন,
-'এটা তো সেই পুরোনো জলপথ!'

অরণ অবাক।
-'জলপথ?'

চাচা বললেন,
-'অনেক বছর আগে বর্ষাকালে এই নালা দিয়ে পানি এসে ওই পুকুরে জমত। পুকুরের পানি দিয়ে গ্রামের মানুষ নানা কাজে ব্যবহার করত।'

রাহি বুঝতে পারল।
-'তাহলে এটা কোনো গোপন সুড়ঙ্গ নয়!'

নাসির স্যার হেসে বললেন,
-'গোপন নয়,কিন্তু ভুলে যাওয়া পথ।'

তিন বন্ধুর উত্তেজনা একটু থামল।
তবু রহস্যের একটা অংশ বাকি।
বাঁশির গায়ে লেখা ছিল-
'ওপারের পথ দেখো।'
আর সেই পথই তাদের এনে দিয়েছে পুরোনো জলাধারের কাছে।
তারা পুকুরের দিকে এগিয়ে গেল।
পুকুরটি এখন প্রায় শুকিয়ে গেছে।
চারদিকে আগাছা।
পাড় ভাঙা।
পানির জায়গায় কাদামাটি আর আবর্জনা।

শিসু মুখ ভার করে বলল,
-'এত সুন্দর পুকুরটা এমন হয়ে গেল কেন?'

রহিম চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
-'একসময় এই পুকুরে শাপলা ফুটত। শীতকালে পাখি আসত। শিশুরা পাড়ে বসে খেলত। পরে মানুষ পুকুরের যত্ন নেওয়া বন্ধ করে দেয়।'

রাহি চারদিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ তার চোখে পড়ল পুকুরের এক কোণে একটি ছোট কাঠের ফলক।

তাতে লেখা-
'পুকুর বাঁচাও, গ্রাম বাঁচাও।'

অরণ বলল,
-'এই লেখাটাও কি সেই একই মানুষের?'

নাসির স্যার বললেন,
-'সম্ভবত কোনো পুরোনো পরিবেশ সচেতনতার উদ্যোগ ছিল। আমাদের আরও খোঁজ নিতে হবে।'

শিসু এবার নিজের বাঁশিটা বের করল।
-'তাহলে বাঁশিটা আমাদের এখানে এনেছে কেন?'

রাহি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
-'হয়তো কোনো মানুষ চেয়েছিল,এই ভুলে যাওয়া জায়গাগুলো আবার কেউ খুঁজে পাক।'

ঠিক তখন গ্রামের এক বৃদ্ধা সেখানে এসে দাঁড়ালেন।
তিনি এতক্ষণ দূর থেকে সব দেখছিলেন।
বললেন,
-'তোমরা কি বাঁশিটা পেয়েছ?'

তিন বন্ধু একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল।
রাহি বলল,
-'হ্যাঁ। আপনি চেনেন?'

বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,
-'ওটা আমার ভাইয়ের বানানো।'

সবাই অবাক।
তিনি বললেন,
-'তোমাদের রহমান মাস্টারের কথা শুনেছ তো?'

রাহি মাথা নেড়ে বলল,
-'হ্যাঁ।'
-'আমার ভাইও সেই পাঠশালায় পড়ত। পরে সে গ্রামে ঘুরে ঘুরে মানুষকে পুকুর,খাল আর গাছ রক্ষার কথা বলত। সে বলত,শিশুদের হাতে যদি প্রকৃতির গল্প পৌঁছানো যায়,তাহলে একদিন তারা নিজেরাই গ্রামকে বদলাবে।'

শিসু মুগ্ধ হয়ে বলল,
-'তাহলে বাঁশিটা...'
-'অনেক বছর আগে সে কয়েকটি বাঁশি বানিয়েছিল। কিছু শিশুদের দিয়েছিল। এই বাঁশিটা কোথায় হারিয়েছিল,আমরা জানতাম না।'

রাহি বাঁশিটা দুহাতে ধরে বলল,
-'এত বছর পর সেটা আবার ফিরে এসেছে!'

বৃদ্ধা হাসলেন।
-'হয়তো সময় হয়েছে তার আবার বাজবার।'

তিন বন্ধু পুকুরটির দিকে তাকাল।
এবার তাদের চোখে রহস্যের উত্তেজনা নেই।
আছে অন্যরকম একটা ভাবনা।

রাহি বলল,
-'আমরা কি এই পুকুরটাকে আবার ভালো করতে পারি?'

নাসির স্যার বললেন,
-'তোমরা একা নয়। গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনা করলে অবশ্যই চেষ্টা করা যায়।'

অরণ বলল,
-'তাহলে বটবনের পাঠশালার পর এবার আমাদের নতুন পাঠ হবে-পুকুরের পাঠ।'

শিসু হেসে উঠল।
-'আর বাঁশিটা হবে আমাদের ডাক!'

রাহি বাঁশিটা ঠোঁটে তুলল।
একটি ছোট্ট সুর ভেসে গেল চারদিকে।
পুকুরের শুকনো পাড়ে বসে থাকা একটি শালিক মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
বাঁশবনের বাতাসও যেন থমকে গেল।
রাহি ডায়েরিতে লিখল,
'আজ বুঝলাম,সব রহস্যের শেষে গুপ্তধন থাকে না। কোনো কোনো রহস্য আমাদের এমন একটি দায়িত্বের কাছে নিয়ে যায়,যা বহু বছর ধরে অপেক্ষা করে আছে।'

তারপর সে লিখল-
'একটি হারানো পথ আজ আমাদের একটি হারানো পুকুরের কাছে নিয়ে এসেছে। এবার পথটা আমরা হারাতে দেব না।'

আজকের সবুজ শিক্ষাঃ
পুরোনো পুকুর, খাল ও জলাভূমি শুধু পানির উৎস নয়। এগুলো পাখি, মাছ, ব্যাঙ, জলজ উদ্ভিদসহ নানা প্রাণীর আবাস এবং স্থানীয় পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এসব জলাশয় রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।

আজকের ছোট্ট তথ্যঃ
প্রাকৃতিক ও স্থানীয় জলাশয় বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে সহায়তা করতে এবং নানা প্রাণীর আবাস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বন্ধুরা,বাঁশবনের রহস্যের একটি দরজা আজ বন্ধ হলো,কিন্তু নতুন একটি গল্প শুরু হলো পুকুরকে ঘিরে।
পরের পর্বে পুকুর পরিষ্কারের পরিকল্পনা করতে গিয়ে রাহি, অরণ ও শিসু পানির ধারে দেখতে পাবে 'অদ্ভুত কিছু পায়ের ছাপ'।ছাপগুলো কোনো মানুষের নয়।কোনো কুকুরেরও নয়।তাহলে রাতে শুকিয়ে যাওয়া পুকুরে কে আসে?
এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তারা আবিষ্কার করবে পুকুরের এমন এক বাসিন্দাকে,যার অস্তিত্ব সম্পর্কে গ্রামের অনেকেই ভুলেই গেছে।