ঢাকার যানজট কমাতে ড্রোন নজরদারি কতটা বদলে দিতে পারে নগর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা!

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৮-২১ ১০:৩১:১৮
image

আকাশে চোখ,সড়কে শৃঙ্খলা

ঢাকার সড়কে যানজট এখন আর কেবল একটি নগর-সমস্যা নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কর্মঘণ্টা, অর্থনীতি ও মানসিক স্বস্তির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলা এক দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা। কোথাও কয়েক মিনিটের অচলাবস্থা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের সড়ক, উড়ালসড়ক কিংবা উড়ালপথে। নিচের সড়কে কী ঘটছে, তার প্রভাব কখনো দেখা যায় বহু দূরের কোনো মোড়ে।

এই জটিল বাস্তবতায় সড়কের প্রচলিত নজরদারির পাশাপাশি এবার আকাশপথে নজরদারির কথা ভাবছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরার পর পরীক্ষামূলকভাবে ড্রোন নজরদারি যুক্ত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে রাজধানীর যান ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
তবে প্রযুক্তি নিজে কোনো জাদুর কাঠি নয়। ড্রোন আকাশ থেকে যানজট দেখতে পারবে, কারণ শনাক্ত করতে পারবে, আইন ভঙ্গের দৃশ্য ধারণ করতে পারবে-কিন্তু ঢাকার যানজটের মূল কারণগুলো যদি একই থাকে, তাহলে শুধু আকাশে চোখ বাড়ালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বরং প্রযুক্তিকে সঠিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
একটি সড়কে যানজটের কারণ সব সময় মাটিতে দাঁড়িয়ে বোঝা যায় না। সামনে একটি গাড়ি বিকল হয়েছে, কোনো বাস যাত্রী ওঠানো-নামানোর জন্য নির্ধারিত স্থানের বাইরে দাঁড়িয়েছে, কেউ উল্টো পথে ঢুকে পড়েছে, কোথাও বেআইনি পার্কিং হয়েছে কিংবা কয়েকটি গাড়ি হঠাৎ লেন পরিবর্তন করেছে-ছোট একটি ঘটনা কয়েক মিনিটের মধ্যে বড় জট তৈরি করতে পারে।
আবার অনেক সময় নিচের সড়কের পাশাপাশি উড়ালসড়ক বা উড়ালপথেও যান চলাচল ধীর হয়ে যায়। তখন সড়কের ওপর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেও প্রকৃত কারণ শনাক্ত করতে সময় লাগে।
ড্রোনের সবচেয়ে বড় সুবিধা এখানেই। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আকাশ থেকে চলমান পরিস্থিতির ছবি পাওয়া গেলে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকক্ষ দ্রুত বুঝতে পারবে কোথায় সমস্যা তৈরি হয়েছে, কোন পথে যানবাহনের চাপ বেশি এবং কোথায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অর্থাৎ ড্রোন শুধু ছবি তোলার যন্ত্র নয়; সঠিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হলে এটি হতে পারে 'দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি চলমান চোখ'।
পরিকল্পনাটি আরও কার্যকর হতে পারে ড্রোনের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি যুক্ত হলে। তখন অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং, উল্টো পথে চলা, সংকেত অমান্য কিংবা অবৈধ পার্কিংয়ের মতো অপরাধ শনাক্ত করা সহজ হবে।
তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-প্রযুক্তির উদ্দেশ্য যেন ‘বেশি মামলা’ করা না হয়।
একজন ট্রাফিক কর্মকর্তার বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ জায়গাটি এখানেই। আইন প্রয়োগের সাফল্য মামলার সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং আইন ভঙ্গের প্রবণতা কমেছে কি না-তা দিয়ে বিচার করা উচিত।
এই দর্শনটি বাস্তবায়ন করা গেলে ড্রোন হবে শাস্তির যন্ত্র নয়, বরং 'শৃঙ্খলা তৈরির প্রযুক্তি'।
প্রাথমিক পর্যায়ে ধারণ করা ভিডিও যাচাই করে তারপর মামলা করার যে সতর্ক পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তি যত আধুনিকই হোক, ভুল শনাক্তকরণ বা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোনো নাগরিককে হয়রানি করা গ্রহণযোগ্য নয়।
ঢাকার যানজটের অন্যতম বড় কারণ গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা। নির্দিষ্ট স্থানে বাস না থামানো, যাত্রী ওঠানোর জন্য সড়কের মাঝখানে বা যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে পড়া, একই রুটের বাসগুলোর মধ্যে যাত্রী সংগ্রহের প্রতিযোগিতা-এসব দৃশ্য নগরবাসীর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা।
বাসচালক ও শ্রমিকের ওপর দৈনিক আয় বা নির্দিষ্ট অর্থ জমা দেওয়ার চাপ থাকলে যাত্রী পাওয়ার প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আর সেই প্রতিযোগিতার ফল গিয়ে পড়ে পুরো সড়ক ব্যবস্থার ওপর।
তাই ড্রোন আকাশ থেকে বাসের অনিয়ম দেখতে পারবে, কিন্তু বাস কেন অনিয়ম করছে-তার অর্থনৈতিক ও ব্যবস্থাপনাগত কারণ সমাধান করতে পারবে না।
এখানেই প্রয়োজন 'ই-টিকিটিং, নির্ধারিত বাসস্টপ,সুশৃঙ্খল বাস রুট এবং সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা'। একই রুটে কোন বাস কখন চলবে, কোথায় থামবে, কতক্ষণ পর পর পরবর্তী বাস আসবে-এসব যদি প্রযুক্তিনির্ভরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে সড়কের ওপর অযথা প্রতিযোগিতাও কমবে।
ড্রোন নজরদারি চালুর ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার-নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও অধিকার।
আকাশ থেকে ধারণ করা ভিডিও কোথায় সংরক্ষণ করা হবে, কতদিন রাখা হবে, কারা তা দেখতে পারবেন, কীভাবে তথ্য ব্যবহার করা হবে-এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। আইন প্রয়োগের নামে যেন নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসর অযথা পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে ড্রোন পরিচালনাকারী সদস্যদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ,তথ্য বিশ্লেষণের দক্ষতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি।কারণ প্রযুক্তির চোখ যত শক্তিশালী হবে,সেই চোখ পরিচালনাকারীর দায়িত্বও তত বেশি হবে।
ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআই ক্যামেরার ব্যবহার ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি ট্রাফিক সংকেতকে প্রযুক্তির আওতায় আনার পাশাপাশি এখন ড্রোন পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শুরুতে একটি ড্রোন দিয়ে কাজটি পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং পর্যায়ক্রমে এর কার্যকারিতা মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে।
তাড়াহুড়ো না করে প্রথমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও যানজটপ্রবণ এলাকায় ড্রোন ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে-কত দ্রুত তথ্য পাওয়া যায়, সিদ্ধান্ত নিতে কতটা সময় কমে, আইন ভঙ্গ শনাক্তকরণ কতটা নির্ভুল হয় এবং বাস্তবে যান চলাচল কতটা স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়।
যদি ফল ইতিবাচক হয়,তাহলে পর্যায়ক্রমে এর পরিধি বাড়ানো যেতে পারে।
শেষ কথা হল, ঢাকার যানজটের সমাধান একক কোনো প্রযুক্তিতে নেই। প্রয়োজন সড়ক ব্যবস্থাপনা,গণপরিবহন সংস্কার, আইন প্রয়োগ, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ।
তবু ড্রোন নজরদারি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দরজা খুলে দিতে পারে। এতদিন ট্রাফিক পুলিশকে সড়কের ভেতর থেকে পরিস্থিতি বুঝতে হয়েছে; এখন আকাশ থেকেও পুরো চিত্র দেখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
আকাশের চোখ যদি মাটির শৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত হয়, প্রযুক্তির তথ্য যদি দ্রুত সিদ্ধান্তে পরিণত হয় এবং আইন প্রয়োগ যদি ন্যায়সংগত ও মানবিক হয়-তবেই ড্রোন নজরদারি ঢাকার যানজট ব্যবস্থাপনায় সত্যিকার পরিবর্তন আনতে পারবে।
শেষ পর্যন্ত আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আকাশে যত বেশি ড্রোন উড়ছে,তা নয়; বরং 'সড়কে যেন কম বিশৃঙ্খলা থাকে,কম সময় নষ্ট হয় এবং মানুষ নিরাপদে ও স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে।' প্রযুক্তির সাফল্য সেখানেই।

লেখকঃ কলামিস্ট, সোস্যাল এক্টিভিস্ট,সাবেক মহাসচিব-নিরাপদ সড়ক চাই (বর্তমান ভাইস-চেয়ারম্যান)।