বন্ধুরা, গত পর্বে আমরা দেখেছি,ঝরে পড়া পাতা আসলে শেষ নয়-নতুন জীবনের শুরু। আজ সেই গল্প আরও গভীরে যাবে। এবার রাহিরা এমন এক জগতের সন্ধান পাবে,যার বাসিন্দাদের অনেককেই খালি চোখে দেখা যায় না।
রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'মাটির নিচের গোপন শহর'
পর্ব-৫৫:
সেদিন দুপুরে বৃষ্টি হয়েছিল।
বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর উঠোনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল এক অদ্ভুত মাটির গন্ধ।
রাহি বারান্দা থেকে নেমে ভেজা মাটির কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
সে গভীরভাবে শ্বাস নিয়ে বলল,
-'বৃষ্টির পর মাটির গন্ধটা এত সুন্দর কেন?'
অরণ বলল,
-'হয়তো ভেজা মাটির গন্ধই এমন।'
শিসু সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-'কিন্তু মাটির ভেতরে কী হয়, সেটা তো আমরা এখনো জানি না!'
রাহি হেসে বলল,
-'তাহলে আজ সেটাই খুঁজে দেখি।'
তিন বন্ধু ছুটে গেল নাসির স্যারের কাছে।
স্যার তাদের হাতে একটি ছোট আতসকাচ দিয়ে বললেন,
-'আজ তোমরা এমন কিছু সম্পর্কে জানবে,যাদের দেখতে এই আতসকাচও যথেষ্ট নয়।'
শিসু অবাক।
-'তাহলে কী দিয়ে দেখতে হবে?'
স্যার মৃদু হেসে বললেন,
-'অনেককে দেখতে বিশেষ ধরনের যন্ত্র লাগে।'
রাহি বিস্মিত হয়ে বলল,
-'মানে, আমাদের পায়ের নিচেই এমন প্রাণী আছে,যাদের আমরা দেখতেই পাই না?'
-'হ্যাঁ।'
বটদাদুর পাতাগুলো তখন মৃদু শব্দ করছিল।
তিনি বললেন,
-'তোমরা যে মাটিকে নীরব ভাবো,সেখানে আসলে অসংখ্য ক্ষুদ্র জীবের ব্যস্ততা চলছে।'
অরণ মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
-'তাহলে এই মাটিও একটা শহর!'
-'শুধু শহর নয়,' বটদাদু বললেন, 'এটি এমন এক শহর, যার অনেক বাসিন্দার নামও তোমরা জানো না।'
নাসির স্যার একটি শুকনো পাতা হাতে তুলে নিলেন।
-'গতকাল যে পাতাটাকে তোমরা দেখেছিলে,মনে আছে?'
তিনজন একসঙ্গে বলল,
-'হ্যাঁ।'
এই পাতাকে মাটিতে ফিরিয়ে দিতে ক্ষুদ্র জীবেরা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। ব্যাকটেরিয়া,ছত্রাকসহ নানা অণুজীব জৈব পদার্থ ভাঙতে সাহায্য করে।'
শিসু চোখ বড় করে বলল,
-'কিন্তু ওদের তো দেখা যায় না!'
তাই বলে ওরা কাজ করে না-এমন নয়,' স্যার বললেন।
রাহি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
-'আমরা তো শুধু ফলাফল দেখি। কাজটা কে করছে,সেটা দেখি না।'
নাসির স্যার হাসলেন।
-'ঠিক তাই।'
বৃষ্টির পানি তখনও পাতার ডগা থেকে টুপটুপ করে পড়ছিল।
রাহি একটি শুকনো পাতা তুলে ভেজা মাটির ওপর রাখল।
তাহলে এই পাতাটাও একদিন মাটির অংশ হয়ে যাবে?'
বটদাদু বললেন,
-'ধীরে ধীরে। আর সেই পথেই তার ভেতরের পুষ্টি আবার প্রকৃতির চক্রে ফিরে যাবে।'
অরণ নোটবই খুলে লিখল,
'নতুন সূত্র-যাদের দেখা যায় না, তারাও পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।'
শিসু হঠাৎ বলল,
-'তাহলে মানুষও কি এমন?'
সবাই তার দিকে তাকাল।
সে একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
-'মানে,কেউ যদি খুব ছোট কাজও করে,তবু সেটা কি বড় কাজে লাগতে পারে?'
রাহি মৃদু হেসে বলল,
-'অবশ্যই।'
বটদাদুর কণ্ঠ আরও কোমল হয়ে উঠল,
-'প্রকৃতি তোমাদের আজ শুধু অণুজীবের কথা শেখায়নি। তোমাদের শেখাল-কোনো কাজকে ছোট করে দেখতে নেই।'
সন্ধ্যার আগে তিন বন্ধু আবার সেই কদমচারাটির কাছে গেল।
চারাটির পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা ঝুলছে।
মাটির নিচে কী চলছে তারা দেখতে পাচ্ছে না।
কিন্তু আজ তারা জানে-
অদৃশ্য সেই জগত থেমে নেই।
হয়তো কোনো অণুজীব শুকনো পাতার একটি অংশ ভাঙছে।
হয়তো কোনো কেঁচো মাটির ভেতর দিয়ে পথ বানাচ্ছে।
হয়তো কোনো ক্ষুদ্র জীব গাছের শিকড়ের আশপাশের জগৎকে আরও জীবন্ত করে তুলছে।
রাহি চোখ বন্ধ করে বলল,
-'আমরা দেখতে না পেলেও প্রকৃতি কাজ করে যাচ্ছে।'
অরণ বলল,
-'তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ত শহরগুলোর একটি হয়তো আমাদের পায়ের নিচেই!'
শিসু হেসে উঠল।
-'আর আমরা এতদিন জানতামই না!'
বাড়ি ফেরার আগে রাহি ডায়েরিতে লিখল,
'আজ বুঝলাম,চোখে দেখা যায় না মানেই অস্তিত্ব নেই-এ কথা কখনো সত্য নয়। পৃথিবীর অনেক বড় কাজ নীরবে, অদৃশ্যভাবেই ঘটে।'
আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি শুধু চোখে দেখা বড় প্রাণী ও বড় গাছ নয়, মাটির ক্ষুদ্র জীবসহ প্রকৃতির অদৃশ্য কর্মীদেরও সম্মান করব।
সবুজ তথ্যঃ
অণুজীব হলো এমন ক্ষুদ্র জীব, যাদের অনেককেই খালি চোখে দেখা যায় না। মাটির ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকসহ নানা অণুজীব জৈব পদার্থ ভাঙা, পুষ্টি পুনরায় মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়া এবং মাটির স্বাভাবিক জীবচক্র বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বন্ধুরা,পরের পর্বের নাম 'শিকড়ের গোপন বন্ধু'। সেখানে রাহি,অরণ ও শিসু আবিষ্কার করবে-গাছের শিকড় শুধু মাটি থেকে পানি ও পুষ্টি নেয় না; মাটির নিচে কিছু অণুজীবের সঙ্গে তাদের এক আশ্চর্য সহযোগিতাও রয়েছে। অর্থাৎ, মাটির গোপন শহরের সঙ্গে গাছেরও রয়েছে অদৃশ্য যোগাযোগ।