বন্ধুরা,গত পর্বের ‘নীরব কৃষক’-এর পর আজ আমরা দেখব,একটি শুকনো পাতা কীভাবে মাটির কাছে ফিরে গিয়ে নতুন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। এই পর্বে রহস্যের সঙ্গে থাকবে কোমল আবেগ ও প্রকৃতির এক অসাধারণ চক্র।
রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'মাটির নিচের গোপন শহর'
পর্ব-৫৪:
সকালে বটগাছের নিচে অসংখ্য শুকনো পাতা ছড়িয়ে ছিল।
রাহি একটা পাতা হাতে তুলে নিয়ে বলল,
-'এই পাতাগুলো সব মরে গেছে,তাই না?'
অরণ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-'গাছ থেকে ঝরে পড়েছে,তাই তো শেষ।'
শিসু একটু ভেবে বলল,
-'কিন্তু বটদাদু তো বলেন,প্রকৃতিতে কিছুই একেবারে শেষ হয় না।'
তিনজনই বটগাছের দিকে তাকাল।
পাতার ফাঁক দিয়ে সকালের আলো নিচে পড়ছে।
বটদাদুর কণ্ঠ ভেসে এল,
-'তোমরা কি সত্যিই মনে করো,এই পাতার গল্প এখানেই শেষ?'
রাহি পাতাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
-'তাহলে এর পরের গল্প কোথায়?'
-'মাটির কাছে যাও।'
তিন বন্ধু হাঁটু গেড়ে বসে পাতাগুলো সরিয়ে মাটি দেখতে লাগল।
একটি পাতা ছিল নরম।
আরেকটির কিনারা কালচে।
কোনোটির শরীর প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
নাসির স্যার এসে বললেন,
-'এটাই পাতার শেষ যাত্রা।'
শিসু অবাক হয়ে বলল,
-'শেষ যাত্রা মানে?'
স্যার বললেন,
-'গাছের পাতা যখন ঝরে পড়ে, তখন তার ভেতরের অনেক জৈব পদার্থ ধীরে ধীরে ভেঙে যেতে থাকে। ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও মাটির নানা ক্ষুদ্র জীব এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।'
অরণ মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
-'মানে,এত ছোট ছোট জীব মিলে পাতাটাকে বদলে দেয়?'
-'হ্যাঁ।'
রাহি বলল,
-'কিন্তু পাতাটা কোথায় যায়?'
স্যার হাসলেন।
-'একেবারে হারিয়ে যায় না।এর কিছু অংশ ধীরে ধীরে মাটিতে মিশে যায় এবং পুষ্টিচক্রের অংশ হয়ে ওঠে।'
শিসু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর হাতে থাকা শুকনো পাতাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
-'তাহলে এটা আবর্জনা নয়!'
বটদাদু বললেন,
-'ঠিক তাই। প্রকৃতির কাছে অনেক সময় যাকে আমরা আবর্জনা ভাবি,সেটিই অন্য জীবের জন্য সম্পদ।'
ঠিক তখনই রাহি পাতাটির নিচে একটি ক্ষুদ্র সাদা ছত্রাকের মতো গঠন দেখতে পেল।
সে চমকে উঠে বলল,
-'স্যার, এটা কী?'
নাসির স্যার বললেন,
-'সম্ভবত ছত্রাকের অংশ। তবে হাত দিয়ে ধরবে না। শুধু দেখবে।'
তিন বন্ধু আরও মনোযোগ দিয়ে তাকাল।
একটি শুকনো পাতা।
তার নিচে ক্ষুদ্র জীবের ব্যস্ততা।
আর তার চারপাশে মাটির নীরব পরিবর্তন।
হঠাৎ শিসু বলল,
-'আমরা যদি সব শুকনো পাতা ঝাড়ু দিয়ে তুলে ফেলে দিই,তাহলে কী হবে?'
স্যার বললেন,
-'সব জায়গায় একই নিয়ম নয়। উঠোন বা পথ পরিষ্কার রাখা দরকার হতে পারে। কিন্তু গাছের নিচে প্রাকৃতিকভাবে পড়ে থাকা পাতা অনেক সময় মাটির জন্য উপকারী। সেগুলো পচে মাটিতে জৈব পদার্থ ফিরিয়ে দেয়।'
রাহি মুগ্ধ হয়ে বলল,
-'তাহলে গাছ নিজের পাতার মধ্য দিয়েই মাটিকে আবার কিছু ফিরিয়ে দেয়!'
বটদাদুর কণ্ঠে যেন দীর্ঘশ্বাসের মতো কোমলতা,
-'হ্যাঁ। গাছ মাটি থেকে নেয়,আবার একদিন মাটিকেই ফিরিয়ে দেয়। এই দেওয়া আর নেওয়ার মধ্যেই প্রকৃতির ভারসাম্য।'
তিন বন্ধু নীরবে বসে রইল।
একটি শুকনো পাতা রাহির হাত থেকে ধীরে মাটিতে পড়ে গেল।
রাহি আর সেটিকে মৃত পাতা বলে মনে করল না।
সে বলল,
-'তাহলে পাতারও একটা দ্বিতীয় জীবন আছে।'
অরণ বলল,
-'আর সেই দ্বিতীয় জীবন শুরু হয় মাটিতে।'
শিসু মুচকি হেসে বলল,
-'তাহলে আজ থেকে আমি শুকনো পাতাকে অন্য চোখে দেখব।'
বটদাদুর পাতাগুলো বাতাসে একসঙ্গে দুলে উঠল।
মনে হলো,বিশাল গাছটি যেন তার ছোট্ট বন্ধুদের কথায় খুশি হয়েছে।
বাড়ি ফেরার আগে রাহি ডায়েরিতে লিখল,
'আজ বুঝলাম,ঝরে পড়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কখনো কখনো ঝরে পড়াই নতুন জীবনের শুরু।'
আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি প্রকৃতির স্বাভাবিক পচন ও পুনর্ব্যবহারের প্রক্রিয়াকে সম্মান করব। গাছের নিচে পড়ে থাকা পাতা অকারণে নষ্ট করব না এবং জৈব আবর্জনা ও সাধারণ আবর্জনার পার্থক্য বুঝব।
সবুজ তথ্যঃ
ঝরে পড়া পাতার জৈব পদার্থ অণুজীব, ছত্রাক ও মাটির অন্যান্য জীবের কার্যক্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ভেঙে যায়। এই প্রক্রিয়ায় পুষ্টি আবার মাটিতে ফিরে আসে এবং উদ্ভিদের জন্য প্রাকৃতিক পুষ্টিচক্র বজায় রাখতে সহায়তা করে।
বন্ধুরা,পরের পর্ব-'চোখে দেখা যায় না যাদের'
সেখানে রাহি, অরণ ও শিসু প্রথমবার বুঝবে-মাটির এই বিশাল গোপন শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত বাসিন্দাদের অনেককেই খালি চোখে দেখাই যায় না। আর সেই আবিষ্কার তাদের ভাবনাকেই বদলে দেবে।