১৯ বছরের সর্বনিম্ন পাসের হার,ফিরল ফলাফলে কঠোর মূল্যায়ন

  • নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • ২০২৬-০৮-১০ ২৩:৩৮:৫৯
image

দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ফল প্রকাশের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এবার পরীক্ষার খাতায় ফিরেছে কঠোর মূল্যায়ন। এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা গেছে চলতি বছরের এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষার ফলে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ এবং শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা; বিপরীতে বেড়েছে কোনো শিক্ষার্থী পাস না করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা।
সোমবার সচিবালয়ে এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
চলতি বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ফলাফলকে খারাপ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক ও সুন্দর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকরা এবার নম্বর দেওয়ার বিষয়ে যথেষ্ট কঠোর ছিলেন।
তিনি জানান, পুনঃনিরীক্ষণের ব্যবস্থাতেও এবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী ফল নিয়ে সংক্ষুব্ধ হলে শুধু নম্বর যোগ-বিয়োগ নয়, তার উত্তরপত্র সম্পূর্ণভাবে পুনঃপরীক্ষণের সুযোগ থাকবে। মূল্যায়নে কোনো ভুল বা অসঙ্গতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং শিক্ষার্থী প্রাপ্য নম্বর থেকে বঞ্চিত হলে তা সংশোধন করা হবে।

সাধারণ বোর্ডে মেয়েদের এগিয়ে থাকা অব্যাহত
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ। এসব বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন।
ফলাফলে বরাবরের মতো এবারও ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। নয়টি সাধারণ বোর্ডে ৬ লাখ ৬২ হাজার ৬৬৩ জন ছেলে পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৮১৪ জন। তাদের পাসের হার ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
অন্যদিকে ৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৭৬ জন মেয়ে পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৫ লাখ ৩ হাজার ৭৯৬ জন। মেয়েদের পাসের হার ৬৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ এগিয়ে।
জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও মেয়েদের অবস্থান শক্তিশালী। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে ৪৭ হাজার ৩০৪ জন ছেলে এবং ৫৮ হাজার ৭০৫ জন মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে।

দাখিল ও কারিগরিতেও কমেছে ফল
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯৮২ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৯৭ জন। পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬ জন।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬৪ জন। পাস করেছে ২৭ হাজার ৯৬৪ জন। পাসের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৯৫১ জন।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তুলনায় দাখিল ও কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের ফলাফল আরও পিছিয়ে রয়েছে।

গণিত-ইংরেজিতে দুর্বলতা বড় কারণ
এবারের ফলাফলে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা। এ দুটি মৌলিক বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় সামগ্রিক ফলাফলেও এর প্রভাব পড়েছে।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের মতে, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করায় এবার প্রকৃত শিখন-ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে আগের তুলনায় ফলাফল কমলেও শিক্ষার্থীদের কোন জায়গায় দুর্বলতা রয়েছে, তা চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, শুধু পাসের হার কমেছে—এভাবে ফলাফল বিচার করলে হবে না। কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে আছে এবং কোন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফল খারাপ হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশেষ করে গণিত ও ইংরেজির মতো মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ঘাটতি চিহ্নিত করে পাঠদানের মান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

শতভাগ পাস কমেছে, বেড়েছে শূন্য পাস
ফলাফলের প্রভাব পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্রেও। এবার শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ৬৬৯টি। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯৬৮টি।
অন্যদিকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেনি—এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩১২টি। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা এবং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

২০০৭ সালের পর সবচেয়ে কম পাস
গত দেড় দশকের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এবারের চিত্রের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। ২০১১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ১৬ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা বেড়ে ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশে পৌঁছায়।
পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে নানা পরিবর্তনের কারণে পাসের হারে ওঠানামা দেখা যায়। করোনাকালে বিশেষ মূল্যায়ন ও বিষয়ভিত্তিক ফল নির্ধারণের কারণে ২০২১ সালে পাসের হার বেড়ে ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছিল।
স্বাভাবিক পরীক্ষাপদ্ধতি ও পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে ফিরে আসার পর আবার পাসের হার কমতে থাকে। ২০২৫ সালে তা ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমেছিল। এবার আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে।
ফলে ২০০৭ সালের পর গত ১৯ বছরের মধ্যে এবারই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার সবচেয়ে কম।

ফল খারাপ, নাকি বাস্তব চিত্র সামনে?
শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে ফলাফলকে কৃত্রিমভাবে ভালো দেখানোর প্রবণতা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ছিল। এবার কঠোর মূল্যায়ন, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস এবং পরীক্ষার মানদণ্ড অনুসরণের ফলে সেই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা স্পষ্ট হয়েছে।
ফলাফল কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা থাকলেও শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছে, বাস্তব শিখন-ঘাটতি সামনে আসা দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। কারণ, শিক্ষার্থীরা কোন বিষয়ে দুর্বল তা জানা গেলে পাঠদান ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়।
এদিকে ফল নিয়ে কোনো শিক্ষার্থী সংক্ষুব্ধ হলে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করতে পারবে। আগামী ১১ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত এ আবেদন করা যাবে।

এসএসসি, ফলাফল, শিক্ষাব্যবস্থা