ইউএনওদের মানবিক প্রশাসনের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

  • সকালের আলো ডেস্ক
  • ২০২৬-০৮-০৯ ১০:৩০:২২
image

মানুষের কল্যাণকে প্রশাসনিক দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে কাজ করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের সুযোগ একটি বড় আমানত। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, বাসযোগ্য ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব সুজাউদ্দৌলা সুজন মাহমুদ সভার বিষয়টি জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য মানুষের সেবা করার সুযোগ আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত। আজ যারা দায়িত্বে আছেন, আগামীকাল তারা থাকবেন না। তাই দায়িত্বের সময়টুকু মানুষের উপকারে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ দেশ রেখে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জনগণ ও সরকারের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তা যে উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেন সেটি হয়তো তাঁর নিজের এলাকা নয়, কিন্তু সেটি বাংলাদেশেরই অংশ। ওই এলাকার মানুষও নিজের এলাকার মানুষের মতো আপন। তাই দেশের প্রতিটি নাগরিককে আপনজন মনে করেই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু আইন তৈরি করলেই সমাজের সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। মানুষকে বোঝানো ও সচেতন করার মাধ্যমেও অনেক সমস্যার সমাধান করা যায়। তাই নিজ নিজ এলাকায় জনসচেতনতা তৈরিতে ইউএনওদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
পরিবেশ রক্ষায় মাঠ প্রশাসনের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দূষণের দিক থেকে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ শহরগুলোর মধ্যে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তনকে আরও এগিয়ে নিতে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগ বাড়াতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক মানুষ নিজ উদ্যোগে উপজেলা ও পৌরসভা এলাকায় গাছ লাগাতে চান। সরকারি কর্মকর্তারা তাদের উৎসাহিত করলে একজনের ১০টি গাছ লাগানোর উদ্যোগ ৫০টি গাছ লাগানোর কর্মসূচিতে রূপ নিতে পারে। এভাবেই প্রশাসন পরিবেশ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
খেলাধুলার প্রসারেও ইউএনওদের স্থানীয়ভাবে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠনকে উৎসাহিত করা গেলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং তরুণদের মধ্যে নিয়ম-শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ গড়ে উঠবে। জাতীয় দিবসের জন্য অপেক্ষা না করে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন উপলক্ষেও খেলাধুলার আয়োজন করা যেতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে দয়া, মায়া ও সহমর্মিতার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। বিভিন্ন মানসিক ও সামাজিক চাপ এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। এই প্রবণতা বাড়তে থাকলে সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসনকে ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, মানুষকে শুধু নিজের কথা ভাবলে চলবে না; অন্যের জন্যও ভাবতে হবে। মানুষের পাশাপাশি পশুপাখি ও প্রকৃতির প্রতিও যত্নশীল হতে হবে। শিশুদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই এ ধরনের মূল্যবোধ গড়ে তুলতে বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক স্তর থেকেই শিশুদের মধ্যে মানবিকতা এবং পশুপাখির প্রতি মায়া-মমতার বিষয়গুলো পাঠ্যক্রমে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের মাধ্যমে যে সহমর্মিতা ও প্রকৃতিপ্রেমের শিক্ষা একসময় গড়ে উঠত, তা অনেক ক্ষেত্রে এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সভায় বিভিন্ন উপজেলায় খাল খনন প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করে উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ায় ইউএনওদের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ সরকার ও জনগণের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
সভায় ইউএনওরা নিজ নিজ এলাকায় খাল খননের পর কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও জনজীবনে পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেন। তারা জানান, অনেক এলাকায় আগে বছরে দুই ফসল উৎপাদন হলেও খাল পুনঃখননের পর সেখানে তিন ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি পানি নিষ্কাশন ও সেচব্যবস্থার উন্নতিতেও সুফল মিলেছে।
খাল খননের সুফল পাওয়া মানুষের পক্ষ থেকে পাঠানো কৃতজ্ঞতার বার্তাও প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন কর্মকর্তারা।
এসব বার্তার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাল খননের অন্যতম লক্ষ্য হলো নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনা। পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, পর্যায়ক্রমে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে পানি সংরক্ষণ, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, জলাবদ্ধতা কমানো এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, উন্নয়নের অর্থ কেবল রাস্তা, ভবন বা অবকাঠামো নির্মাণ নয়। মানুষের মধ্যে মানবিকতা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও সচেতনতা তৈরি করাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সভায় খাল খনন প্রকল্পের উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া ৮৩টি উপজেলার ইউএনও ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ইউএনও, মানবিকতা, খালখনন