নিসচার মহাসমাবেশে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ১২ দফা কর্মপরিকল্পনা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • ২০২৬-০৮-০৭ ২৩:৫২:২৬
image

দেশে নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ রেলপথ ও নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করতে সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)। সংগঠনটি সরকারের হাতে ‘নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ও ১২ দফা সুপারিশপত্র’ আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দিয়েছে।
শুক্রবার রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় ‘নিসচা’র ১১তম মহাসমাবেশ-২০২৬’। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আয়োজিত এ মহাসমাবেশে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে প্রায় দেড় হাজার সড়কযোদ্ধা, গবেষক, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, পরিবহন খাতের প্রতিনিধি ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ, এমপি। সভাপতিত্ব করেন নিসচার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয়।
নিরাপদ সড়ক চাই-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একার দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। ব্যক্তিগত শোক থেকেই এই আন্দোলনের সূচনা হলেও আজ এটি জাতীয় জনআন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর আইন প্রয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাংলাদেশেও সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। যতদিন দেশের প্রতিটি মানুষ নিরাপদে ঘরে ফিরতে না পারবে, ততদিন নিসচার আন্দোলন চলবে।
নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন এবং মানুষের জীবন রক্ষার এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সভাপতির বক্তব্যে মিরাজুল মইন জয় বলেন, সড়ক নিরাপত্তা এখন শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম জাতীয় ইস্যু। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি শক্তিশালী জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গঠন, কেন্দ্রীয় দুর্ঘটনা তথ্যভান্ডার প্রতিষ্ঠা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, স্পিড ক্যামেরা এবং তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, মানুষের ভুলকে প্রাণহানিতে পরিণত হতে না দেওয়ার মতো নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে সরকারের কাছে বাস্তবভিত্তিক ১২ দফা জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তুলে দেওয়া হয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নাটক, চলচ্চিত্র, সংগীত, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তার বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ বলেন, নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন, চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিতকরণ, ডিজিটাল মনিটরিং এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে কাজ করছে। তিনি নিসচার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও সুপারিশকে নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে উল্লেখ করেন।
মহাসমাবেশে উপস্থাপিত ১২ দফা সুপারিশে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গঠন, কেন্দ্রীয় দুর্ঘটনা তথ্যভান্ডার প্রতিষ্ঠা, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট নির্মূল, প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ, সড়ক-রেল-নৌপথের সমন্বিত নিরাপত্তা, শিক্ষাক্রমে সড়ক নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্তি, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর আগে মহাসমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন নিরাপদ সড়ক চাই এর সাবেক মহাসচিব ও বর্তমান ভাইস-চেয়ারম্যান এস এম আজাদ হোসেন,ব্রাক রোড সেফটি প্রোগ্রাম এর ম্যানেজার সাবেক যুগ্ম-সচিব খালেদ মাহমুদ ও রোড সেফটি বিশেষজ্ঞ তাইফুর রহমান।
 এস এম আজাদ হোসেন তার বক্তব্যে বলেন- আজ আমরা এখানে শুধু একটি সংগঠনের সমাবেশে উপস্থিত হইনি; আমরা একত্রিত হয়েছি একটি স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে। সেই স্বপ্নের নাম-'নিরাপদ সড়ক,নিরাপদ বাংলাদেশ।'
একটি দুর্ঘটনা কখনো শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; এটি একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে,একজন মায়ের বুক খালি করে,একজন বাবার সব স্বপ্ন ভেঙে দেয়। তাই সড়ক নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়,এটি মানবতার বিষয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের জীবনের অধিকার।
আজ যারা দেশের নানা প্রান্ত থেকে এখানে এসেছেন,আপনারা প্রত্যেকে একজন 'সড়কযোদ্ধা'। আপনাদের হাতে অস্ত্র নেই,কিন্তু আছে সচেতনতার শক্তি। আপনাদের কণ্ঠে ঘৃণা নেই,আছে জীবনের পক্ষে উচ্চারণ। এই শক্তিই একদিন বাংলাদেশের প্রতিটি সড়ককে আরও নিরাপদ করে তুলবে-এই বিশ্বাস আমরা ধারণ করি।
আমাদের প্রিয় 'ইলিয়াস কাঞ্চন' শুধু একজন বরেণ্য অভিনেতা নন; তিনি ব্যক্তিগত শোককে জাতীয় আন্দোলনে রূপ দিয়েছেন। একজন মানুষের বেদনা কীভাবে কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচানোর সংগ্রামে পরিণত হতে পারে,তার উজ্জ্বল উদাহরণ তিনি। তাঁর এই ত্যাগ ও নেতৃত্ব আমাদের জন্য প্রেরণার বাতিঘর।তিনি সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, নীতিনির্ধারক, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিনীত আহ্বান জানিয়ে বলেন-নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা যেন শুধু প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। আইনের কঠোর প্রয়োগ, দক্ষ চালক তৈরি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো এবং সবার জন্য সমান দায়িত্ববোধ-এসব বাস্তবায়নেই বদলে যাবে দেশের সড়কব্যবস্থা।
১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনকে হারানোর পর একই বছরের ২৯ নভেম্বর ইলিয়াস কাঞ্চনের উদ্যোগে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। তিন দশকের বেশি সময় ধরে সংগঠনটি জনসচেতনতা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, নীতিগত সংস্কার এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে।

নিরাপদ সড়ক, নিসচা, ইলিয়াস কাঞ্চন