মহেশখালী-কক্সবাজার রুটে আসা-যাওয়ায় টোল ১০০ টাকা,নৌভাড়ার চেয়েও বেশি ঘাট টোল,ক্ষুব্ধ পর্যটক

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৮-০৭ ২১:০৬:৩৪
image

মহেশখালী(কক্সবাজার)
সমুদ্র,পাহাড়,দ্বীপ,মন্দির,বৌদ্ধবিহার,রাখাইন সংস্কৃতি,পান ও লবণচাষ প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অনন্য সমন্বয়ে মহেশখালী বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্য। কক্সবাজারে আসা পর্যটকদের জন্য খুব অল্প সময়ে ঘুরে দেখার সুযোগ থাকায় দিন দিন মহেশখালীকে ঘিরে পর্যটকদের আগ্রহও বাড়ছে।
কিন্তু এই সম্ভাবনার বিপরীতে মহেশখালী-কক্সবাজার নৌপথে যাতায়াত ব্যয় ও ঘাট ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পর্যটক ও যাত্রীদের অভিযোগ, আসা-যাওয়ার পথে ঘাটে প্রবেশের জন্য মোট ১০০ টাকা টোল দিতে হচ্ছে। ফলে একজন পর্যটকের নৌযানের ভাড়ার পাশাপাশি শুধু ঘাট টোল বাবদই উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
পর্যটকদের প্রশ্ন একদিকে মহেশখালীকে পর্যটনবান্ধব গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা, অন্যদিকে প্রবেশপথেই বাড়তি টোল; তাহলে পর্যটন বিকাশের নীতি বাস্তবে কতটা কার্যকর?
নৌভাড়ার চেয়েও বেশি টোলের অভিযোগ
মহেশখালী-কক্সবাজার রুটে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের নৌযান চলাচল করে। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত স্থানীয় প্রতিবেদনে স্পিডবোটের ভাড়া ১১০ টাকা এবং গামবোটের ভাড়া ৫০ টাকা নির্ধারণের কথা জানানো হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে রুটটিতে বিপুলসংখ্যক স্পিডবোট ও অন্যান্য ট্রলার চলাচলের তথ্যও উল্লেখ করা হয়।
এর আগে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উদ্যোগে কক্সবাজার-মহেশখালী নৌপথে সি-ট্রাক সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিলে নিয়মিত সি-ট্রাক চলাচলের সময় কক্সবাজারের ৬ নম্বর জেটিঘাট থেকে মহেশখালী যেতে ভাড়া ৫০ টাকা এবং নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
অর্থাৎ, পর্যটকদের কাছে প্রশ্নটি শুধু ১০০ টাকা টোলের নয়; প্রশ্ন হচ্ছে যাতায়াতের মূল ভাড়ার সঙ্গে টোলের এই অতিরিক্ত ব্যয় কতটা যৌক্তিক এবং এর বিপরীতে যাত্রীরা কী সেবা পাচ্ছেন?
পরিবার নিয়ে ঘুরতে গেলে বাড়ে খরচ
একজন পর্যটকের ক্ষেত্রে ১০০ টাকা হয়তো খুব বড় অঙ্ক মনে নাও হতে পারে। কিন্তু পরিবার, বন্ধু বা পর্যটক দলের ক্ষেত্রে হিসাবটি দ্রুত বড় হয়ে যায়।
চারজনের একটি পরিবার মহেশখালী ভ্রমণে গেলে শুধু আসা-যাওয়ার টোল বাবদ দিতে হতে পারে ৪০০ টাকা। ছয়জনের একটি দল হলে তা দাঁড়ায় ৬০০ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে নৌযানের ভাড়া, কক্সবাজার শহর থেকে ঘাটে যাতায়াত, মহেশখালীর অভ্যন্তরে অটোরিকশা বা ইজিবাইকের ভাড়া এবং খাবারের খরচ।
ফলে স্বল্প ব্যয়ে একদিনে মহেশখালী ঘুরে আসতে চাওয়া মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য মোট ভ্রমণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিতে এ ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে পর্যটকের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ পর্যটক সাধারণত এমন গন্তব্য বেছে নিতে চান যেখানে যাতায়াত সহজ, ভাড়া পূর্বনির্ধারিত এবং অতিরিক্ত খরচের ঝুঁকি কম।
মহেশখালীর পর্যটন সম্ভাবনা বিশাল
মহেশখালী বাংলাদেশের অন্যতম ব্যতিক্রমী দ্বীপাঞ্চল। পাহাড় ও সমুদ্রের পাশাপাশি এখানে রয়েছে আদিনাথ মন্দির, বৌদ্ধবিহার, রাখাইন সংস্কৃতি, পানবরজ, লবণের মাঠ এবং উপকূলীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
পর্যটন বিষয়ক বিভিন্ন গাইড ও প্রতিবেদনে আদিনাথ মন্দিরসহ মহেশখালীর প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কথা উঠে এসেছে। কক্সবাজার থেকে সহজে যাতায়াত করা যায় বলেই মহেশখালীকে কক্সবাজারকেন্দ্রিক পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারিত গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০২৫ সালে সি-ট্রাক সার্ভিস চালুর সময়ও স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করেছিলেন, নিয়মিত ও নিরাপদ নৌযোগাযোগ পর্যটন ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত সহজ করবে। প্রতিবেদনে আদিনাথ মন্দিরসহ পর্যটন আকর্ষণের কারণে মহেশখালীতে সারা বছর পর্যটক আসার কথাও উল্লেখ করা হয়।
পর্যটন উন্নয়ন নাকি প্রবেশপথেই বাড়তি ব্যয়?
বিশ্বের সফল পর্যটন গন্তব্যগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পর্যটকের জন্য যাতায়াত ও প্রবেশব্যবস্থা যতটা সম্ভব সহজ, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য রাখা।
কিন্তু মহেশখালীতে পর্যটককে নৌযানের ভাড়া দেওয়ার পরও যদি আলাদাভাবে ঘাট টোল দিতে হয় এবং সেই টোলের হার নিয়ে পর্যটকের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়, তাহলে সেটি পর্যটন ব্যবস্থাপনার জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে।
বিশেষ করে কক্সবাজারের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত পর্যটন এলাকার পাশে মহেশখালীকে নতুন পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমেই পর্যটকের আস্থা তৈরি করা জরুরি।
টোলের বিনিময়ে কী সেবা পাচ্ছেন পর্যটক?
টোল আদায় নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো এই অর্থের বিনিময়ে যাত্রী ও পর্যটক কী সেবা পাচ্ছেন?
ঘাটে কি পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা রয়েছে?
পর্যটকদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ অপেক্ষাকক্ষ আছে কি?
নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য আলাদা সুবিধা রয়েছে কি?
ঘাটে পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা হচ্ছে কি?
টোল আদায়ের ক্ষেত্রে প্রত্যেক যাত্রীকে কি নিয়মিত রসিদ দেওয়া হচ্ছে?
টোলের হার কি সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত?
ঘাট ইজারা বা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এই টোলের সম্পর্ক কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কারভাবে প্রকাশ্যে না থাকলে টোল আদায়কে ঘিরে জনমনে সন্দেহ ও অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
টোল আদায়ের নীতিতে স্বচ্ছতা জরুরি
মহেশখালী উপজেলা প্রশাসনের সরকারি পোর্টালে ২০২৬ সালের হাটবাজার ইজারা বিজ্ঞপ্তিসহ বিভিন্ন ইজারা-সংক্রান্ত সরকারি নোটিশ প্রকাশিত হয়েছে।
তবে মহেশখালী-কক্সবাজার নৌপথের ঘাটে বর্তমানে যে ৫০ টাকা করে টোল আদায়ের অভিযোগ উঠেছে, তার আইনি ভিত্তি, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ, ইজারা চুক্তি,টোলের নির্ধারিত হার এবং অর্থ কোথায় জমা হচ্ছে-এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ সরকারি অনুমোদিত টোল এবং অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় দুটি বিষয় এক নয়। ফলে টোল আদায়ের বিষয়ে নথিপত্র প্রকাশ করা হলে যাত্রীদের বিভ্রান্তি যেমন কমবে, তেমনি কর্তৃপক্ষের প্রতিও আস্থা বাড়বে।
সি-ট্রাক চালুর পরও কেন নৌপথে অনিশ্চয়তা?
মহেশখালী-কক্সবাজার নৌপথে সি-ট্রাক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল মূলত নিরাপদ ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী যাতায়াত নিশ্চিত করার প্রত্যাশায়। ২০২৫ সালে নিয়মিত সি-ট্রাক সার্ভিস চালুর সময় ২৫০ আসনের সি-ট্রাক দিনে তিনবার দুই দিক থেকে চলাচলের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল বিআইডব্লিউটিএ।
এই উদ্যোগের ফলে যাত্রীদের প্রত্যাশা ছিল রুটে প্রতিযোগিতা বাড়বে, ভাড়া নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং দীর্ঘদিনের যাতায়াত সমস্যার সমাধান হবে।
কিন্তু নৌযানভাড়া, ঘাট টোল এবং সার্ভিসের ধারাবাহিকতা নিয়ে যদি নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে সি-ট্রাকসহ সরকারি উদ্যোগের কাঙ্ক্ষিত সুফল কতটা পাওয়া যাচ্ছে
সেটিও মূল্যায়নের দাবি রাখে।
পর্যটন শিল্পে বহুমুখী প্রভাবের আশঙ্কা
মহেশখালীতে পর্যটক কমে গেলে শুধু পর্যটকেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। ক্ষতির মুখে পড়বেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও।
পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল
স্থানীয় পরিবহন চালক;
রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকান;
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী;
পান ও স্থানীয় কৃষিপণ্য বিক্রেতা;
হস্তশিল্প ব্যবসায়ী;
স্থানীয় গাইড;
নৌযান শ্রমিক;
ছোট উদ্যোক্তা ও পর্যটনসেবা প্রদানকারী-
সবাই পর্যটক কমে যাওয়ার প্রভাব অনুভব করতে পারেন।
অন্যদিকে পর্যটন বাড়লে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগও বাড়তে পারে। তাই পর্যটনকে শুধু দর্শনার্থী আনার বিষয় হিসেবে না দেখে স্থানীয় অর্থনীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পর্যটকদের অভিযোগ তদন্তে মাঠপর্যায়ে নজরদারি প্রয়োজন
পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত মনিটরিং প্রয়োজন।
ঘাটে একটি দৃশ্যমান স্থানে 
“নৌযানের ভাড়া কত”
“ঘাট টোল কত”
“অন্যান্য ফি কত”
এভাবে স্পষ্ট তালিকা টানিয়ে দিলে পর্যটক ও যাত্রীদের বিভ্রান্তি কমবে।
একই সঙ্গে প্রতিটি আদায়ের বিপরীতে রসিদ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হলে অনিয়মের সুযোগ কমবে।
পর্যটনবান্ধব মহেশখালীর জন্য করণীয়
মহেশখালীকে পর্যটনের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে কয়েকটি বিষয় জরুরি 
প্রথমত, টোল ও নৌযানের ভাড়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত,অনুমোদিত ভাড়া ও টোলের তালিকা ঘাটে প্রকাশ্যে টাঙাতে হবে।
তৃতীয়ত, অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্তে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
চতুর্থত, পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য নৌযান নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, সি-ট্রাক সার্ভিস নিয়মিত ও কার্যকর রাখতে হবে।
ষষ্ঠত,ঘাটে পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, আলো, বসার ব্যবস্থা ও পর্যটকবান্ধব তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
সপ্তমত, কক্সবাজার-মহেশখালীকে সমন্বিত পর্যটন সার্কিট হিসেবে প্রচার করা যেতে পারে।
মহেশখালীর পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে পর্যটকের জন্য শুধু দর্শনীয় স্থান থাকলেই হবে না; সহজ যোগাযোগ, সাশ্রয়ী ভাড়া, স্বচ্ছ ফি, নিরাপদ নৌযান এবং হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
একজন পর্যটক মহেশখালীতে যাওয়ার আগেই যদি অতিরিক্ত খরচের হিসাব করতে বাধ্য হন, তাহলে সেই গন্তব্যকে পর্যটনবান্ধব করে তোলার লক্ষ্য প্রশ্নের মুখে পড়বে।
তাই মহেশখালী-কক্সবাজার নৌপথে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে ১০০ টাকা টোলের যৌক্তিকতা, এর অনুমোদন,আদায়ের পদ্ধতি এবং টোলের বিনিময়ে প্রদত্ত সেবা সবকিছু জনসম্মুখে পরিষ্কার করা এখন সময়ের দাবি।
পর্যটনকে এগিয়ে নিতে হলে পর্যটকের পকেট নয়, বরং পর্যটকের আস্থা ও স্বাচ্ছন্দ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মহেশখালীকে সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার পথে এই টোল ব্যবস্থা যেন নতুন বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এটাই এখন স্থানীয় বাসিন্দা,পর্যটক ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।