বন্ধুরা, আজ শুরু হচ্ছে এক নতুন অধ্যায়। এবার রহস্যের কেন্দ্রে এমন এক প্রাণী,যাকে অনেকেই ভুল বোঝে। কিন্তু প্রকৃতির কাছে সে এক অমূল্য বন্ধু।
রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'নিঃশব্দ পাহারাদার'
পর্ব–৪৬:
সন্ধ্যার পর থেকেই গ্রামের আকাশটা অদ্ভুত সুন্দর।
পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ আলো মিলিয়ে যেতেই ধীরে ধীরে উঠল গোল চাঁদ।
রাহি উঠোনে বসে বই পড়ছিল। এমন সময় শিসু দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-'রাহি! বড় আমগাছটার কাছে সবাই জড়ো হয়েছে। কেউ বলছে,অদ্ভুত ডানাওয়ালা প্রাণী দেখা গেছে!'
অরণও ছুটে এল।
-'চলো, দেখে আসি।'
তিন বন্ধু আমবাগানের দিকে এগিয়ে গেল।
গাছের নিচে কয়েকজন দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ একটি কালো ছায়া দ্রুত উড়ে গেল।
তারপর আরেকটি।
আবার আরেকটি।
কেউ একজন ভয়ে বলল,
-'ওগুলো নিশ্চয়ই অশুভ কিছু!'
রাহি শান্ত গলায় বলল,
-'ভয় পাওয়ার আগে চিনে নেওয়া দরকার।'
ঠিক তখনই পুরোনো বটগাছের পাতা মৃদু শব্দ তুলল।
বটদাদুর কণ্ঠ ভেসে এল,
-'প্রকৃতির কোনো প্রাণীকে শুধু তার চেহারা দেখে বিচার করা যায় না।'
অরণ টর্চ জ্বালাল, কিন্তু আলো গাছের গায়ে ফেলল,আকাশে নয়।
সে জানে,বন্য প্রাণীর চোখে সরাসরি আলো ফেলা উচিত নয়।
কিছুক্ষণ পর একটি প্রাণী নিচু হয়ে উড়ে পাশের কাঁঠালগাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে রইল।
শিসু বিস্ময়ে বলল,
-'ও তো উল্টো হয়ে আছে!'
ঠিক তখনই পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন গ্রামের বিজ্ঞান শিক্ষক নাসির স্যার।
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
-'ওটি বাদুড়। পাখি নয়,এটি একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী।'
শিসুর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
-'স্তন্যপায়ী? তাহলে ও কি বাচ্চাকে দুধ খাওয়ায়?'
-'হ্যাঁ,' স্যার বললেন,'ঠিক মানুষের মতোই।'
রাহি খাতায় লিখল,
'প্রথম সূত্র-বাদুড় পাখি নয়,স্তন্যপায়ী প্রাণী।'
এমন সময় তারা দেখল,একটি বাদুড় পাকা জামরুলে মুখ দিল,তারপর অন্য গাছের দিকে উড়ে গেল।
বটদাদু বললেন,
-'প্রকৃতির অনেক গাছের বীজ ছড়িয়ে দিতে আর ফুলে পরাগায়ণে বাদুড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।'
অরণ অবাক হয়ে বলল,
-'তাহলে ওরা শুধু নিজেদের জন্য উড়ে বেড়ায় না,বনকেও বড় হতে সাহায্য করে!'
হালকা বাতাসে আমপাতা দুলে উঠল।
দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
চাঁদের আলোয় বাদুড়গুলোর ছায়া এক গাছ থেকে আরেক গাছে উড়ে যাচ্ছে।
রাহির মনে হলো,রাতের আকাশে যেন নিঃশব্দে কাজ করে চলেছে একদল অদেখা কর্মী।
ফেরার আগে শিসু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
-'আজ বুঝলাম,রাতেরও অনেক বন্ধু আছে,শুধু আমরা তাদের চিনি না।'
বটদাদুর কণ্ঠে ভেসে এল দিনের শেষ শিক্ষা,
-'যে প্রাণীকে মানুষ ভুল বোঝে,প্রকৃতি অনেক সময় তাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়।'
তিন বন্ধু বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল।
কিন্তু রাহির মনে নতুন প্রশ্ন জন্ম নিল-
সব বাদুড় কি ফল খায়?
নাকি রাতের আকাশে তাদেরও আছে ভিন্ন ভিন্ন গল্প?
আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি কোনো বন্য প্রাণী সম্পর্কে না জেনে ভয় বা কুসংস্কার ছড়াব না। আগে জানব,তারপর অন্যদেরও সঠিক তথ্য জানাব।
সবুজ তথ্যঃ
পৃথিবীতে এক হাজারেরও বেশি প্রজাতির বাদুড় রয়েছে। বেশির ভাগ বাদুড় ফল,ফুলের মধু বা পোকামাকড় খায়। অনেক বাদুড় রাতে ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষি ও পরিবেশের উপকার করে।
চলবে...
বন্ধুরা,আজ থেকে শুরু হলো 'নিঃশব্দ পাহারাদার' অধ্যায়। এই অধ্যায়ে আমরা বাদুড় নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ভাঙব,তোমাদের বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান দেব এবং প্রকৃতির প্রতি তোমাদের ভালোবাসা আরও গভীর করব।