ভোক্তার জানার অধিকার নিশ্চিতেই এফওপিএল: নীতিনির্ধারণে গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • ২০২৬-০৭-২৮ ১৫:৫৫:৫২
image

গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া নিরাপদ খাদ্য ও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের উদ্যোগে আয়োজিত "বাংলাদেশে প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে লেবেলিং (এফওপিএল) বিষয়ক গণমাধ্যম প্রচারাভিযান" শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্থূলতা ও কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশই ঘটছে এসব প্রতিরোধযোগ্য অসংক্রামক রোগে। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও ক্ষতিকর ট্রান্সফ্যাটের অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতিকে এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান নিয়মে প্যাকেটের পেছনে ক্ষুদ্র অক্ষরে লেখা জটিল পুষ্টিগুণ সাধারণ মানুষের পক্ষে বুঝে ওঠা অসম্ভব হওয়ায়, সাধারণ ভোক্তাদের সহজে স্বাস্থ্যকর খাদ্য নির্বাচনে সহায়তা করতে খাদ্যপণ্যের সামনের অংশে স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক 'ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং' (এফওপিএল) বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে কর্মশালাটি শুরু হয়। তিনি বলেন, "খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও চর্বির উপস্থিতি আমাদের নীরবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শিশু ও তরুণদের বাঁচাতে হলে এফওপিএল নীতিমালার কোনো বিকল্প নেই। এফওপিএল নিয়ে প্রবিধানমালা করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, যেখানে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণে গণমাধ্যমের গুরুত্ব অপরিসীম।"
অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাপট ও বিষয়বস্তু তুলে ধরে গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস বলেন, "আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বাংলাদেশে একটি সহজ ও বাধ্যতামূলক এফওপিএল নীতিমালা প্রণয়নে সরকার কাজ করছে। অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে এবং এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে খাদ্য পরিবেশকে নিরাপদ করার মতো প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সবাইকে নিজের অবস্থান থেকে একসাথে কাজ করতে হবে।" বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতিক ইজাজ তাঁর শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলেন, "নিরাপদ খাদ্য নিয়ে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। আমরা অহরহ নিজের পরিবার এবং সন্তানদের জন্য না জেনে বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার কিনি। জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ বজায় রাখা সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য, এজন্য সাংবাদিকদের ধারাবাহিক ভাবে প্রতিবেদন করতে হবে।" বারডেম জেনারেল হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ সামসুন নাহার মহুয়া সতর্ক করে বলেন, "শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত খাবারের আসক্তি বাড়ছে, যা তাদের অল্প বয়সেই স্থূলতা ও হৃদরোগের ঝুঁকিতে ফেলছে। কোনটা স্বাস্থ্যকর আর কোনটা ক্ষতিকর—তা তাৎক্ষণিকভাবে চেনার উপায় হিসেবে প্যাকেটের সামনের সহজ সংকেত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।" বাংলাভিশনের সিনিয়র নিউজ এডিটর আবু রুশদ মো. রুহুল আমিন জানান, এফওপিএল হলো এমন একটি সহজ ও স্পষ্ট সংকেত বা লেবেলিং ব্যবস্থা, যা খাদ্যপণ্যের সামনের অংশেই ক্ষতিকর মাত্রার অতিরিক্ত উপাদান সম্পর্কে ক্রেতাকে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সতর্ক করে। ল্যাটিন আমেরিকার চিলি ও মেক্সিকোর মতো বিশ্বের বহু দেশে বাধ্যতামূলক এফওপিএল চালুর ফলে যেমন ভোক্তার সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি খাদ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোও তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর পণ্য বাজারে আনতে বাধ্য হয়েছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, "জনস্বাস্থ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দিতে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে গণমাধ্যমের শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে বস্তুনিষ্ঠ এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিভ্রান্তি দূর করে নীতি বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো সম্ভব।"
কর্মশালার শেষাংশে উপস্থিত সবাই একমত প্রকাশ করেন যে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার, খাদ্য শিল্পমালিক, গবেষক, ভোক্তা অধিকার সংস্থা এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অসংক্রামক রোগের ভয়াবহ ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) নীতি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকেরা সংবাদ ও সচেতনতামূলক প্রতিবেদন প্রচারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।