'নদীর বুকে ভাসমান বন-শেষ পর্ব'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৭-২৮ ১১:৩১:২৩
image

বন্ধুরা, আজ পর্ব-৪২, আজকের পর্বে রাহি,অরণ ও শিসু শুধু রহস্যের অনুসন্ধান করবে না,তারা নিজেরাই হবে প্রকৃতির রক্ষক। এই পর্ব থেকে তাদের ছোট্ট উদ্যোগ একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে।

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
'প্রকৃতির গোয়েন্দারা'
পর্ব-৪২

সকাল থেকেই নদীর ওপর হালকা বাতাস বইছে।
দূরে সাদা বকের সারি উড়ে যাচ্ছে।
করিম কাকার নৌকায় চেপে রাহি, অরণ আর শিসু আবার সেই ভাসমান বনের কাছে এল।

আজ তাদের হাতে শুধু নোটবই নয়।
সঙ্গে আছে কয়েকটি বড় কাপড়ের ব্যাগ,একটি লম্বা বাঁশ আর দড়ি।

শিসু হাসতে হাসতে বলল,
-'আজ আমরা শুধু দেখব না, কাজও করব।'

বটদাদুর কণ্ঠ ভেসে এলো,
-'প্রকৃতির সত্যিকারের বন্ধু শুধু সমস্যা দেখে না,সমাধানের পথও খুঁজে।'

নৌকা ধীরে ধীরে ভাসমান বনের পাশ দিয়ে এগোতে লাগল।
হঠাৎ রাহির চোখে পড়ল, কচুরিপানার ফাঁকে আটকে আছে অনেক প্লাস্টিকের বোতল,খাবারের মোড়ক আর ভাঙা থার্মোকলের টুকরো।

অরণ গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
'এই ময়লাগুলোই তো প্রাণীদের বিপদে ফেলছে।'

করিম কাকা সাবধানে নৌকা থামালেন।
সবাই মিলে বাঁশের সাহায্যে একে একে ভাসমান আবর্জনাগুলো তুলে কাপড়ের ব্যাগে রাখতে শুরু করল।

কিন্তু তারা খেয়াল রাখল,কোনো গাছ,শেওলা বা প্রাণীর ক্ষতি যেন না হয়।

ঠিক তখনই একটি ছোট মাছ পানির ওপর লাফ দিল।
তারপর আরেকটি।
মনে হলো, নদী যেন তাদের কাজ দেখে খুশি হয়েছে।

শিসু হেসে বলল,
-'দেখো! ওরাও যেন আমাদের ধন্যবাদ দিচ্ছে।'

ঠিক সেই সময় দূর থেকে কয়েকজন জেলে নৌকা নিয়ে এগিয়ে এলেন।
তারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-'তোমরা কী করছ?'

রাহি উত্তর দিল,
-'নদী পরিষ্কার করছি না। আমরা নদীর বাসিন্দাদের ঘর বাঁচানোর চেষ্টা করছি।'

একজন প্রবীণ জেলে মুগ্ধ হয়ে বললেন,
-'আমরা এত দিন শুধু মাছ দেখেছি। আজ বুঝলাম,মাছেরও একটি পৃথিবী আছে।'

সবাই মিলে আরও কিছু আবর্জনা তুলে ফেলল।
এরপর করিম কাকা নদীর ঘাটে একটি কাঠের ফলক বসালেন।
ফলকে লেখা ছিল-
'নদী আমাদের জীবন।
নদীতে ময়লা ফেলবেন না।
প্রাণীদের ঘর রক্ষা করুন।'

বটদাদুর কণ্ঠ আনন্দে ভরে উঠল।
-'একটি ভালো কাজ কখনো একা থাকে না। একজন শুরু করলে অনেকেই তার সঙ্গে যোগ দেয়।'

ফেরার সময় তারা দেখল,সেই ছোট কচ্ছপটি আবার ভাসমান বনের পাশে মাথা তুলে শ্বাস নিল।
একটি মাছরাঙা কাছের ডালে বসে আছে।
নীল ফড়িং বাতাসে নাচছে।
সাদা বক ধীর পায়ে খাবার খুঁজছে।

রাহি মৃদু হেসে বলল,
-'আজ ভাসমান বনটা যেন আরও সুন্দর লাগছে।'

অরণ উত্তর দিল,
-'কারণ আজ আমরা শুধু দর্শক নই,রক্ষকও।'

শিসু দু'হাত তুলে নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
-'আমরা আবার আসব। তোমাদের খোঁজ নিতে।'

হঠাৎ বাতাসে বটপাতার মৃদু শব্দ ভেসে এলো।
বটদাদুর কণ্ঠে শেষ কথাগুলো যেন নদীর জলে ছড়িয়ে পড়ল-
'প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে শুধু তার সৌন্দর্য দেখা নয়। তাকে নিরাপদ রাখার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া।'

সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে।
নদীর বুকে সোনালি আলো ঝিকমিক করছে।
ভাসমান বনটি ধীরে ধীরে স্রোতের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে।
আর তার সঙ্গে ভেসে চলেছে তিনটি ছোট্ট হৃদয়ের বড় একটি স্বপ্ন-

একটি সবুজ,পরিচ্ছন্ন,প্রাণবৈচিত্র্যে ভরা পৃথিবীর স্বপ্ন।

আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি যেখানে ভ্রমণ করব,সেখানে কোনো আবর্জনা ফেলে আসব না। প্রকৃতিকে যেমন পেয়েছি,তার চেয়ে সুন্দর রেখে আসার চেষ্টা করব।

সবুজ তথ্যঃ
নদী,বিল ও জলাভূমি শুধু মানুষের জন্য নয়,অসংখ্য মাছ,পাখি,কচ্ছপ,ব্যাঙ,পোকামাকড় ও জলজ উদ্ভিদের আবাসস্থল। একটি জলাশয় পরিষ্কার রাখা মানে পুরো একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা।

চলবে...

বন্ধুরা, আজ 'নদীর বুকে ভাসমান বন' অভিযানের সমাপ্তি হলো। পর্ব-৪৩ থেকে আমরা শুরু করবো একেবারে নতুন রহস্য-
'বৃষ্টির পর রঙধনুর গোপন বার্তা'।
এবার রাহি,অরণ ও শিসু রঙধনুকে শুধু আকাশের সৌন্দর্য হিসেবে নয়,আলো,পানি ও প্রকৃতির বিস্ময়কর বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে আবিষ্কার করবে। এতে শিশুদের বিজ্ঞান,কল্পনা ও পরিবেশচেতনা একসঙ্গে বিকশিত হবে।