পিকেটিং ছাড়াই নজিরবিহীন হরতাল: উত্তর ফটিকছড়িতে স্থবির জনজীবন

  • হাসান মেহেদী:
  • ২০২৬-০৭-২৭ ২০:৪২:১৯
image

নবগঠিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা সদর যৌক্তিক স্থানে স্থাপনের দাবিতে ফটিকছড়ির ৩ ইউনিয়নে ৪৮ ঘণ্টার হরতালের শেষ দিনেও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে নজিরবিহীন হরতাল পালিত হয়েছে। হরতালে দূরপাল্লার যানবাহনসহ সব ধরনের মোটরযান চলাচল বন্ধ ছিল। কেবল ওষুধের দোকান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কিছু দোকান ছাড়া বন্ধ ছিল অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকসহ সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক কার্যক্রম থেমে ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ খোলা থাকলেও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়।
​হরতালে বালুটিলা ও সোনাইপুল সীমান্তে শতশত পণ্যবাহী ট্রাক আটকা পড়ে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আটকাপড়া ট্রাকের চালক ও দূরপাল্লার যাত্রীরা। কোনো ধরনের সহিংস ঘটনা ছাড়াই কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে উত্তর ফটিকছড়ির জনজীবন। গত ১ জুলাই ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার নাম ও সদর দপ্তর হিসেবে পশ্চিম ভূজপুর মৌজার স্থান নির্ধারণ করে গ্যাজেট প্রকাশের পর থেকেই মধ্যবর্তী স্থানে সদর স্থাপনের দাবিতে নতুন উপজেলার অন্তর্ভুক্ত ছয়টির মধ্যে তিনটি ইউনিয়নে এবং নতুন উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত না হতে চেয়ে সুয়াবিল ইউনিয়নে এই আন্দোলন ও হরতাল চলছে।
​সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কে অবস্থান করছেন নারী, পুরুষ ও শিশুসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে তাদের হাতে হরতালের সমর্থনে চেনা কোনো পিকেটিংয়ের সরঞ্জাম ছিল না। উল্টো ঢোল-তবলা আর হারমোনিয়াম বাজিয়ে গানবাজনা করতে দেখা যায়। এমনকি হাফেজি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের রাস্তায় বসে পবিত্র কুরআন পাঠ ও নামাজ আদায় করতে দেখা যায়। সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে রাস্তায় রান্না করে খাওয়া-দাওয়ার অভিনব দৃশ্যও চোখে পড়ে।
​সোমবার সকালে ভারতের সীমান্তবর্তী বাগানবাজার ইউনিয়নের সোনাইপুল, মীরসরাইয়ের সীমানাঘেঁষা বালুটিলা ও নারায়ণহাট ইউনিয়নের ভূজপুর সীমানায় অন্তত ৩০টি স্পটে হাজার হাজার মানুষ সড়কে অবস্থান নেন। উত্তরের বৃহত্তম বাণিজ্যিক কেন্দ্র হেয়াকো বাজারেও কোনো ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম হয়নি।
​চট্টগ্রামের নবগঠিত উপজেলা 'ফটিকছড়ি উত্তর'-এর সদর দপ্তর মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপনের দাবিতে উপজেলা বাস্তবায়ন পরিষদ এই ৪৮ ঘণ্টা হরতাল কর্মসূচি আহ্বান করে। তবে প্রশাসনের অনুরোধে সময় ছয় ঘণ্টা কমিয়ে সোমবার রাত বারোটা পর্যন্ত হরতাল চলবে বলে জানান আন্দোলনের সমন্বয়ক ও বিজিএমইএ-র সহ-সভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী।
​আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকার ঘোষিত বর্তমান স্থান 'পশ্চিম ভূজপুর মৌজা' উপজেলার একদম দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত, যা বর্তমান উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে। অন্যদিকে সুদূর সীমান্তসংলগ্ন বাগানবাজার, হেয়াকো বা বালুটিলার সাধারণ মানুষকে প্রশাসনিক কাজের জন্য ৪২ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে, যা চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করবে। তারা সর্ব উত্তরের এই তিন ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াত সুবিধার কথা বিবেচনা করে দাঁতমারা ও নারায়ণহাট ইউনিয়নের মধ্যবর্তী কোনো যৌক্তিক স্থানে সদর দপ্তর স্থানান্তরের জোর দাবি জানান। পাশাপাশি, ১৭ কিলোমিটার দূরত্বের নতুন উপজেলার সাথে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে সুয়াবিল ইউনিয়নের বাসিন্দারাও।
​হরতালের সমর্থনে বালুটিলা বাজার, চিকনছড়া বাজার, গার্ডের দোকান, হেয়াকো, দাঁতমারা, শান্তিরহাট ও নারায়ণহাট এলাকায় বিক্ষোভ করেন বাস্তবায়ন পরিষদের কর্মীরা। বিকেলে হেয়াকো বাজারের জিরো পয়েন্টে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন উপজেলা সদর বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক একরামুল হক বাবুল চেয়ারম্যান, সদস্য সচিব আবুল খায়ের, সমন্বয়ক ও বিজিএমইএ সহ-সভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী, নুরুল আমিন আজাদ, শেখ মনির হায়দার, একরামুল হক, নুরুল আলম নুরু, এবিএম সিদ্দিক, সেলিম মজুমদার, মহিউদ্দিন মেম্বার প্রমুখ।
​ভূজপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপুল চন্দ্র দে জানান, উত্তর উপজেলা সদর দপ্তরকে কেন্দ্র করে দাঁতমারা, নারায়ণহাট ও বাগানবাজার তিন ইউনিয়নের বিভিন্ন সড়কে হরতালের সমর্থকেরা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করেছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল।