মহেশখালীর নৌপথে অস্থিরতা: অতিরিক্ত চার্জ,সি-ট্রাক সংকট ও বিআইডব্লিউটিএকে ঘিরে প্রশ্নের পাহাড়

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৭-২৬ ২১:০৯:৫৪
image

মহেশখালী (কক্সবাজার) 
বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী আজ দেশের অন্যতম কৌশলগত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি অবকাঠামো, লবণ শিল্প, মৎস্যসম্পদ ও পর্যটনের কারণে প্রতিদিন হাজারো মানুষ এবং বিপুল পরিমাণ পণ্য এই দ্বীপে যাতায়াত করে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জমে উঠেছে অসন্তোষ।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, যাত্রী, নৌযান মালিক এবং সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি।
সি-ট্রাক বন্ধ বা অনিয়মিত চলাচলে জনদুর্ভোগ
মহেশখালী-কক্সবাজার নৌপথে সি-ট্রাক কেবল একটি পরিবহন নয়; এটি দ্বীপবাসীর জীবনরেখা। শিক্ষার্থী, রোগী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী সবারই প্রধান ভরসা এই নৌযান। কিন্তু সি-ট্রাকের অনিয়মিত চলাচল বা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার অভিযোগ নতুন নয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সি-ট্রাক চলাচল ব্যাহত হলেই যাত্রীদের বিকল্প নৌযানে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়। ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনে ব্যয় বেড়ে যায় এবং অনেক সময় জরুরি রোগী পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হয়।

অতিরিক্ত চার্জের অভিযোগ
নৌযান সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে ট্রেক, বার্জিং চার্জসহ বিভিন্ন নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে আদায়ের হার ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য দেওয়া হয় না। এতে সরকারি নির্ধারিত ফি ও বাস্তবে আদায়কৃত অর্থের মধ্যে পার্থক্য আছে কি না সে প্রশ্নও উঠছে।
যদি এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা শুধু যাত্রীদের ওপর নয়, পুরো দ্বীপাঞ্চলের অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক মহলের প্রতিক্রিয়া
সম্প্রতি এক আলোচনায় কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ও সাবেক ছাত্রদল আহ্বায়ক তারেক রহমান জুয়েল অভিযোগ করে বলেন, বিআইডব্লিউটিএকে দ্রুত সুশাসনের আওতায় না আনলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে। তিনি আরও দাবি করেন, জনগণের স্বার্থবিরোধী যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক
মহেশখালী এখন শুধু একটি দ্বীপ নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ প্রকল্প, লবণচাষ, মৎস্য আহরণ এবং পর্যটন খাতের ওপর হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। ফলে নৌপথে সেবা ব্যাহত হলে তার প্রভাব স্থানীয় বাজার থেকে শুরু করে জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।
কী বলছেন স্থানীয়রা?
স্থানীয়দের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে
নৌপথে আদায়কৃত সব ধরনের সরকারি ফি প্রকাশ্যে টানিয়ে দিতে হবে।
অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে হবে।
সি-ট্রাকের নিয়মিত সময়সূচি নিশ্চিত করতে হবে।
অনিয়মে জড়িত কেউ থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
যাত্রীসেবা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মত
জননীতি ও সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, দেশের কৌশলগত অঞ্চলে পরিবহনসেবা যদি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও নিয়মিত না হয়, তাহলে বিনিয়োগ, ব্যবসা ও জনসেবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বাস্তব অবস্থা মূল্যায়ন জরুরি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পাওয়া যায়নি। তাদের মতামত পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহ প্রকাশ করা হবে।
মহেশখালীর উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না; নিরাপদ, স্বচ্ছ ও নিরবচ্ছিন্ন নৌপরিবহনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ, সি-ট্রাক সেবা নিয়ে অসন্তোষ এবং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ যদি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হয় এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার গ্রহণ করা হয়, তাহলে দ্বীপবাসীর আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের সম্ভাবনাও আরও সুসংহত হবে।