আজকের গল্পটি শুধু উপদেশ নয়,একটি আনন্দময় অভিযানও হবে।
রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
পর্ব-৩০:
ভোরের সূর্যটা আজ যেন একটু বেশি উজ্জ্বল।
রাহি ঘুম থেকে উঠেই দেখল, উঠোনে অরণ দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি কাপড়ের ব্যাগ। ব্যাগের ভেতর ছোট ছোট গাছের চারা।
শিসুও দৌড়ে এসে বলল,
-'আজ কিন্তু ভুলে যেও না!'
রাহি হেসে জিজ্ঞেস করল,
-'কী ভুলব না?'
শিসু চোখ টিপে বলল,
-'আজ আমাদের সবুজ প্রতিজ্ঞার দিন!'
কয়েক দিন আগে স্কুলের শিক্ষক একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। গ্রামের সব শিশু মিলে আজ একটি 'সবুজ উৎসব' করবে। কেউ গাছের চারা আনবে,কেউ ফুলের বীজ,কেউ পাখিদের জন্য মাটির পানির পাত্র, আবার কেউ কাপড়ের ব্যাগ বানিয়ে আনবে।
স্কুলের মাঠে পৌঁছে রাহি দেখল,চারদিকে উৎসবের আমেজ।
এক পাশে দেশীয় গাছের চারা।
অন্য পাশে শিশুদের আঁকা পরিবেশ বিষয়ক ছবি।
আরেক পাশে লেখা-
'আমার সবুজ পৃথিবী,আমার দায়িত্ব।'
ঠিক তখনই পুরোনো বটগাছের পাতায় বাতাস খেলল।
বটদাদুর স্নেহভরা কণ্ঠ ভেসে এল,
-'আজ কোনো রহস্যের সমাধান করতে হবে না। আজ নিজেদের বদলানোর দিন।'
অনুষ্ঠান শুরু হলো।
প্রথমে শিক্ষক সবাইকে বললেন,
-'গত কয়েক মাসে তোমরা শুধু গল্প পড়োনি। তোমরা শিখেছ নদীকে ভালোবাসতে,জোনাকিকে রক্ষা করতে,প্রজাপতির জন্য ফুল লাগাতে,বনের প্রাণীদের সম্মান করতে,গাছের কথা শুনতে,বীজের যত্ন নিতে, পাখিদের জন্য পানি রাখতে এবং খাল পরিষ্কার রাখতে। আজ সেই শেখাগুলোকে কাজে লাগানোর দিন।'
রাহি ও অরণ মিলে স্কুলের পেছনের খালি জায়গায় তিনটি দেশীয় গাছের চারা রোপণ করল।
শিসু ছোট ছোট মাটির পাত্রে পরিষ্কার পানি ভরে গাছের ছায়ায় রেখে দিল।
কয়েকজন বন্ধু কাপড়ের ব্যাগ বিলিয়ে বলল,
-'আজ থেকে বাজারে গেলে আমরা প্লাস্টিকের ব্যাগ নেব না।'
আরেকদল শিশু স্কুলের চারপাশ পরিষ্কার করতে শুরু করল।
কেউ শুকনো পাতা আলাদা করল।
কেউ প্লাস্টিক আলাদা করে পুনর্ব্যবহারের ঝুড়িতে রাখল।
ঠিক তখনই একটি দোয়েল উড়ে এসে নতুন লাগানো চারার পাশে বসে মিষ্টি সুরে ডাকল।
শিসু আনন্দে বলল,
-'দেখো! আমাদের উৎসবে অতিথিও এসেছে!'
সবাই হেসে উঠল।
বটদাদু বললেন,
-'প্রকৃতি কখনো হাততালি দেয় না। কিন্তু যখন সে পাখির গান শোনায়, নতুন পাতা গজায় কিংবা ফুল ফুটিয়ে দেয়, তখন বুঝবে সে খুশি হয়েছে।'
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে শিক্ষক একটি বড় সাদা কাপড় মাটিতে বিছিয়ে দিলেন।
তিনি বললেন,
-'যারা আজ থেকে সবুজ পৃথিবীর বন্ধু হতে চাও,তারা এখানে নিজেদের নাম লিখে দাও।'
এক এক করে সবাই নিজের নাম লিখল।
রাহি লিখল।
অরণ লিখল।
শিসু একটু কাঁপা হাতে বড় বড় অক্ষরে নিজের নাম লিখে বলল,
-'আজ থেকে আমি শুধু গাছের বন্ধু নই,পুরো পৃথিবীর বন্ধু।'
হঠাৎ হালকা বাতাস বইতে শুরু করল।
বটগাছের কয়েকটি শুকনো পাতা মাটিতে নেমে এলো।
বটদাদুর কণ্ঠে যেন আনন্দের সুর।
-'আজ তোমরা শুধু একটি প্রতিজ্ঞা করোনি। তোমরা ভবিষ্যতের জন্য একটি বীজ বুনেছ। সেই বীজ একদিন হাজারো সবুজ স্বপ্নে পরিণত হবে।'
বিকেলের রোদ নরম হয়ে এলে সবাই মিলে একটি ছবি তুলল।
ছবির পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল সেই পুরোনো বটগাছ।
আর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ভবিষ্যতের সবুজ পৃথিবীর ছোট্ট স্বপ্নবাজেরা।
আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি প্রতিদিন অন্তত একটি পরিবেশবান্ধব কাজ করব। গাছ,নদী,পাখি,প্রাণী ও প্রকৃতিকে ভালোবাসব এবং অন্যদেরও সচেতন করব।
সবুজ তথ্যঃ
একজন শিশুর একটি ভালো অভ্যাস অনেক সময় পুরো পরিবারকে বদলে দিতে পারে। তাই পরিবেশ রক্ষার বড় পরিবর্তনও শুরু হতে পারে একটি ছোট কাজ থেকে।
বন্ধুরা,পর্ব-৩১ থেকে আমাদের নতুন অধ্যায় 'প্রকৃতির গোয়েন্দারা'। এখানে রাহি,অরণ,শিসু ও বটদাদু পরিবেশের রহস্য খুঁজে বের করবে-কোথায় পাখি কমে যাচ্ছে,কেন পুকুর শুকিয়ে যাচ্ছে,কেন কিছু গাছ আর ফুল ফুটছে না।