'বৃষ্টির দিনে সবুজ বন্ধুরা'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৭-১৪ ১২:২০:৪৮
image

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
পর্ব–২৮:

সারারাত বৃষ্টি হয়েছে।

ভোরে ঘুম ভাঙতেই রাহি জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, গ্রামের ছোট্ট পথগুলো পানিতে ঢেকে গেছে। পুকুরের পানি উপচে উঠেছে। দূরের মাঠটাও যেন ছোট্ট এক হ্রদ।

অরণ ছাতা মাথায় নিয়ে দৌড়ে এল।
-'রাহি, চল! খালের পানি অনেক বেড়ে গেছে।'

শিসুও পিছিয়ে নেই।
-'আমি দেখেছি, কয়েকটা পিঁপড়া তাদের ডিম মুখে করে উঁচু জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে।'

রাহি অবাক হয়ে বলল,
-'তাহলে ওরা আগেই বুঝে গেছে!'

ঠিক তখনই বটগাছের পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা টুপটাপ করে পড়তে লাগল।

বটদাদুর শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল,
-'প্রকৃতির অনেক প্রাণী মানুষের আগেই আবহাওয়ার পরিবর্তন টের পায়। তাই তারা নিজেদের রক্ষা করার প্রস্তুতিও আগে শুরু করে।'

চারজন খালের দিকে এগিয়ে গেল।
দেখল,খালের এক পাশে প্লাস্টিকের বোতল,পলিথিন আর নানা আবর্জনা জমে পানির চলার পথ আটকে গেছে। ফলে পানি উপচে পাশের রাস্তায় উঠে এসেছে।

অরণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
-'বৃষ্টি তো প্রতি বছরই হয়। কিন্তু পানি নামতে পারছে না কেন?'

বটদাদু বললেন,
-'বৃষ্টি কখনো শত্রু নয়। শত্রু হলো আমাদের সেই কাজগুলো,যেগুলো খাল ভরাট করে, ড্রেন বন্ধ করে, গাছ কেটে ফেলে আর মাটিকে শ্বাস নিতে দেয় না।'

রাহি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
-'তাহলে শুধু অভিযোগ করলে হবে না। আমাদেরও কিছু করতে হবে।'

তারা গ্রামের বড়দের খবর দিল।

সবাই মিলে নিরাপদভাবে খালের মুখে জমে থাকা প্লাস্টিক ও ভাসমান আবর্জনা সরিয়ে দিল। যেসব কাজ বড়দের তত্ত্বাবধান ছাড়া করা নিরাপদ নয়, সেগুলো বড়রাই করলেন। রাহি, অরণ আর শিসু দূর থেকে বর্জ্য আলাদা করার কাজে সাহায্য করল।
অল্প সময়ের মধ্যেই আটকে থাকা পানি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
ঠিক তখনই শিসু দেখল, একটি ছোট্ট চড়ুই ভিজে ডানা নিয়ে নিচু ডালে বসে আছে।

রাহি বলল,
-'ওকে ধরো না। ডালটা যেন নড়ে না যায়। একটু সময় পেলেই ও নিজেই শক্তি ফিরে পাবে।'

কিছুক্ষণ পর সত্যিই চড়ুইটি ডানা মেলে উড়ে গেল।

শিসুর মুখে হাসি ফুটল।
-'আজ শুধু মানুষ নয়,পাখিটাও যেন বাঁচল।'

বিকেলে বৃষ্টি থেমে গেলে গ্রামের শিশুরা মিলে একটি নতুন কাজ শুরু করল।
তারা রাস্তায়,খালের পাশে এবং স্কুলের সামনে ছোট ছোট কাগজে লিখে লাগাল-

'ময়লা ফেলবেন না।'
'খাল বাঁচলে,গ্রাম বাঁচবে।'
'গাছ লাগান,পানি বাঁচান।'

শিক্ষক তাদের দেখে বললেন,
-'তোমাদের এই ছোট ছোট কাজই একদিন বড় পরিবর্তন আনবে।'

সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে পশ্চিম আকাশে রঙধনু উঠল।

রাহি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
অরণ বলল,
-'দেখো, ঝড়-বৃষ্টির পরও আকাশ হাসতে জানে।'

বটদাদু মৃদু স্বরে বললেন,
-'প্রকৃতি আমাদের শিখিয়ে দেয়, প্রতিটি দুর্যোগের পর নতুন করে শুরু করার সাহস রাখতে হয়। কিন্তু সেই নতুন শুরুর জন্য প্রকৃতির প্রতিও আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।'

রাহি, অরণ আর শিসু হাত বাড়িয়ে একসঙ্গে বলল,
-'আমরা আমাদের গ্রাম, আমাদের খাল, আমাদের গাছ আর আমাদের পৃথিবীকে ভালোবাসব। কারণ সবুজ পৃথিবীই নিরাপদ ভবিষ্যৎ।'

আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি কখনো খাল, ড্রেন বা জলাশয়ে প্লাস্টিক ও আবর্জনা ফেলব না। বৃষ্টির সময় নিজের নিরাপত্তা বজায় রাখব এবং পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে সবার সঙ্গে কাজ করব।

সবুজ তথ্যঃ
খাল, ড্রেন ও জলাভূমি প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরিয়ে নিতে সাহায্য করে। এসব স্থানে আবর্জনা ফেললে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে জলাবদ্ধতা ও স্থানীয় বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

পুনশ্চঃ
এই পর্বটি শুধু একটি গল্প নয়,'এই সময়ের বাংলাদেশের শিশুদের জন্য একটি ছোট্ট পরিবেশ-বার্তা'।

আগামীকাল পর্ব-২৯-'নদীর বুকে সবুজ দ্বীপ'।
এই গল্পে রাহি ও অরণ আবিষ্কার করবে, কীভাবে নদীর মাঝের ছোট্ট চর ও দ্বীপগুলো অসংখ্য পাখি, গাছ আর প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে।