'পাখিদের সকালবেলার সভা'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৭-১৩ ১৪:৪৯:১৬
image

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
পর্ব–২৭

ভোরের আকাশ তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের লাল আভা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। শিশিরে ভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাহি আর অরণ গ্রামের বড় বটগাছের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

হঠাৎ শিসু ফিসফিস করে বলল,
-'আস্তে হাঁটো! সামনে কিছু একটা হচ্ছে।'

তিনজনই থেমে গেল।
বটগাছের ডাল,পাশের আমগাছ,কদমগাছ আর বাঁশঝাড়ে একসঙ্গে বসে আছে অনেক পাখি। শালিক, দোয়েল, বুলবুলি, ঘুঘু, ফিঙে, টুনটুনি, এমনকি কয়েকটি সবুজ টিয়াও।

অদ্ভুত ব্যাপার, কেউ উড়ে যাচ্ছে না।

সবাই যেন কারও অপেক্ষায়।

অরণ বিস্ময়ে বলল,
-'এত পাখি একসঙ্গে! এরা কি সত্যিই কোনো সভা করছে?'

ঠিক তখনই বাতাসে বটপাতা নরম শব্দ তুলল।

বটদাদুর কণ্ঠ ভেসে এল।
-'প্রকৃতির প্রতিটি সকালই একটি নতুন শুরু। আর পাখিদের এই একত্র হওয়ার পেছনেও আছে একটি কারণ।'

রাহি ধীরে জিজ্ঞেস করল,
-'কী কারণ, বটদাদু?'

-'সারাদিন কোথায় খাবার মিলবে,কোথায় নিরাপদে থাকা যাবে,কোথায় শিকারির আশঙ্কা আছে,এসব বিষয়ে পাখিরা নিজেদের মধ্যে নানা ধরনের সংকেত আদান-প্রদান করে। মানুষের মতো ভাষা নয়,কিন্তু তাদের ডাক,ভঙ্গি আর আচরণেই লুকিয়ে থাকে সেই বার্তা।'

শিসু চোখ বড় বড় করে বলল,
-'তাহলে ওরা একে অপরকে খবর দেয়?'

-'ঠিক তাই,' মৃদু হেসে বললেন বটদাদু।

এমন সময় একটি ফিঙে হঠাৎ তীক্ষ্ণ স্বরে ডাক দিল।

মুহূর্তের মধ্যে কয়েকটি ছোট পাখি ডাল বদলে নিরাপদ জায়গায় চলে গেল।

রাহি দেখল, আকাশের অনেক ওপরে একটি শিকারি পাখি চক্কর দিচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর বিপদ কেটে গেলে আবার সব পাখি স্বাভাবিক হয়ে গেল।

অরণ বলল,
-'একটি পাখির সতর্কবার্তায় এতগুলো পাখি বেঁচে গেল!'

বটদাদু বললেন,
-'প্রকৃতিতে একে অপরকে সাহায্য করার শিক্ষা অনেক পুরোনো।'

ঠিক তখনই শিসুর চোখ পড়ল গাছের নিচে।
একটি ছোট্ট মাটির পাত্র উল্টে পড়ে আছে। ভেতরে এক ফোঁটা পানিও নেই।
-'এটা কে রেখেছিল?'

রাহি বলল,
-'হয়তো কেউ গরমের সময় পাখিদের জন্য পানি রেখেছিল। এখন শুকিয়ে গেছে।'

অরণ দৌড়ে বাড়ি থেকে একটি কলসি ভরে পানি এনে পাত্রটি ভরে দিল।

শিসু আশপাশে পড়ে থাকা শুকনো ডাল দিয়ে পাত্রটির চারপাশ পরিষ্কার করল।

কিছুক্ষণ পর একটি দোয়েল নিচে নেমে এলো।

সে একটু পানি খেল।

তারপর আরেকটি শালিক।

এরপর একে একে আরও কয়েকটি পাখি।

শিসু আনন্দে বলল,
-'দেখো! আজকের সভা শেষে ওরা যেন আমাদের ধন্যবাদ দিচ্ছে।'

বটদাদু হেসে বললেন,
-'মানুষ যদি একটু যত্ন করে,প্রকৃতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিজের ভাষায়।'

সেদিন স্কুলে গিয়ে রাহি একটি নতুন প্রস্তাব দিল।
-'আমরা কি স্কুলের আঙিনায় পাখিদের জন্য পানি আর ছোট্ট খাবারের ব্যবস্থা করতে পারি?'

শিক্ষক খুশি হয়ে বললেন,
-'চমৎকার ভাবনা। তবে মনে রেখো, পাখিদের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হলো গাছ। যত বেশি দেশীয় গাছ থাকবে, তত বেশি পাখি ফিরে আসবে।'
পরের সপ্তাহেই শিক্ষার্থীরা স্কুল প্রাঙ্গণে কয়েকটি দেশীয় ফলদ ও ছায়াগাছের চারা লাগাল। গাছের পাশে রাখা হলো দুটি মাটির পানির পাত্র।
ভোরবেলা আবার সেই পরিচিত বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে রাহি আকাশের দিকে তাকাল।
আজ পাখিদের ডাক যেন আরও সুরেলা।

অরণ মৃদু হেসে বলল,
-'হয়তো আজকের সভায় আমাদের কথাও উঠেছে।'

বটদাদু বললেন,
-'যে পৃথিবীতে পাখির গান শোনা যায়,সে পৃথিবী এখনো বেঁচে আছে। সেই গান যেন কোনো দিন থেমে না যায়।'

রাহি, অরণ আর শিসু একসঙ্গে মাথা তুলে উড়ে যাওয়া পাখিদের দেখল।

তাদের মনে হলো,প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর সকাল শুরু হয় পাখির ডানার শব্দে।

আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি পাখিদের বিরক্ত করব না। সুযোগ পেলে তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ,পরিষ্কার পানি এবং গাছপালা রক্ষায় ভূমিকা রাখব।

সবুজ তথ্যঃ
পাখিরা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না। তারা বীজ ছড়িয়ে নতুন গাছ জন্মাতে সাহায্য করে,ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই পাখি রক্ষা মানে প্রকৃতিকে রক্ষা করা।


আগামীকালের পর্ব-২৮ 'বৃষ্টির দিনে সবুজ বন্ধুরা' হবে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি হৃদয়স্পর্শী গল্প-অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা,মানুষ ও প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা এবং প্রকৃতি রক্ষার বার্তা নিয়ে।