প্রকাশিত হলো ঢাকাবিষয়ক বিশেষ গ্রন্থ বিটুইন কেয়স অ্যান্ড কোহেশন: অ্যান এক্সপ্লোসিভ রি-ইমার্জেন্স অব ঢ

  • ফোজিত শেখ বাবু
  • ২০২৬-০৭-০৮ ১৯:২৮:২১
image

দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিবিষয়ক জার্নাল সাউথ এশিয়ান কালচারাল স্টাডিজ এর ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ গ্রন্থ বিটুইন কেয়স অ্যান্ড কোহেশন: অ্যান এক্সপ্লোসিভ রি-ইমার্জেন্স অব ঢাকা এর প্রকাশনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের ভ্রুম্যান কক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে শিক্ষক, স্থপতি, গবেষক, লেখক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্টজনেরা অংশ নেন।
গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন তাসলিম শাকুর ও ইমামুর হোসেন। সাউথ এশিয়ান কালচারাল স্টাডিজ–এর উদ্যোগে এবং একাডেমিক প্রেস অ্যান্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরির সহযোগিতায় এটি প্রকাশিত হয়েছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বইটির পেছনের প্রচ্ছদে লিখেছেন, ঢাকাকে শুধু নীতি ও পরিকল্পনার চোখে দেখলে এই শহরকে পুরোপুরি বোঝা যাবে না, তাকে বুঝতে হয় তার অস্তিত্বের গভীরতায় যেতে হবে।
শহরের আদি বাসিন্দাদের স্মৃতি আর তার সাথে শহরটির বহু স্তর এবং নতুন বাসিন্দাদের একের পর এক আগমনে গড়ে ওঠা ঢাকা একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঢাকাকে পাঠ করতে হবে। নগর নিয়ে প্রচলিত আলোচনা যেখানে প্রায়ই সমস্যা ও সমাধানের ছকে আটকে থাকে, সেখানে এই বই সেই চেনা বয়ান থেকে সরে এসে ঢাকাকে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, দাবি ও টানাপোড়েনের এক পরিসর হিসেবে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছে বলে তিনি লিখেছেন।
তাঁর মতে, অনেক সময় ক্লান্তিকর হলেও সব সময়ই কৌতূহলজাগানিয়া এই বদলে চলা মহানগরকে বুঝতে বইটি একটি স্বাগত সংযোজন।
দীর্ঘদিনের গবেষণা, আলোচনা, লেখালেখি ও সম্পাদনার মধ্য দিয়ে গ্রন্থটি প্রস্তুত করা হয়েছে। গ্রন্থটির ভিত্তি গড়ে ওঠে ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ‘পলিটিক্যাল ট্রান্সফরমেশনস, চেঞ্জিং হেরিটেজ অ্যান্ড নেগোশিয়েটিং আইডেনটিটিজ: প্ল্যানিং, ডিজাইনস অ্যান্ড দ্য ইভলভিং কালচারস অব ঢাকা’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক কর্মশালাকে ঘিরে।
সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজসহ কয়েকটি আন্তর্জার্তিক গবেষণা কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ওই কর্মশালায় মূল বক্তব্য দিয়েছিলেন হোসেন জিল্লুর রহমান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন এবং নারী অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার আন্দোলনের পরিচিত মুখ শিরীন পারভীন হক।
তিনি ঢাকাকে শুধু ভৌত অবকাঠামো, জনসংখ্যার চাপ বা অপরিকল্পিত নগরায়ণের মধ্য দিয়ে না দেখে মানুষের জীবন, স্মৃতি, অধিকার, সংগ্রাম ও অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে বোঝার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
গ্রন্থের সম্পাদক তাসলিম শাকুর ও ইমামুর হোসেন প্রকাশনার পটভূমি, বিষয়বস্তু এবং দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্ব নিয়ে কথা বলেন। তাঁরা জানান, গ্রন্থটিতে ঢাকাকে একক ও স্থির পরিচয়ের শহর হিসেবে দেখা হয়নি।
বরং রাজনৈতিক পরিবর্তন, জনআন্দোলন, স্থানচ্যুতি, অনানুষ্ঠানিক বসতি, আবাসন, ধর্মীয় আচার, স্মৃতি, খাদ্যসংস্কৃতি এবং দৈনন্দিন নগরজীবনের মধ্য দিয়ে শহরটির বহুমাত্রিক রূপ তুলে ধরা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে গ্রন্থে প্রকাশিত প্রবন্ধের একাধিক লেখক উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তাসলিম শাকুর, ইমামুর হোসেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ আমিনুল করিম। দেশের বাইরে অবস্থান করায় কয়েকজন লেখক অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত হতে পারেননি।
তবে তাঁদের গবেষণা, লেখা ও সম্পাদনা-সহযোগিতার কথাও অনুষ্ঠানে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তাঁরা নিজেদের গবেষণার বিষয়, ঢাকার পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এবং গ্রন্থটির সামগ্রিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করেন।
গ্রন্থটির লেখকদের মধ্যে আরও রয়েছেন নুব্রাস সামায়ীন, অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, মো. রাশেদ ভূঁইয়া, পারিসা শাকুর, সানজিদা আহমেদ সিনথিয়া, সৈয়দা জাফরিনা ন্যান্সি, ফারিবা সামিয়া অমি, ফোজিত শেখ বাবু, মো. ইফতেখার রশিদ, আদিল মোহাম্মদ, মাতলুবা খান, থমাস অ্যানিউরিন স্মিথ, নোভা আমিন খান, ডেইজি ওর্তেগা রোমান, তানভীর খান, সুনীলা আহমেদ, সুশীল ঘোষ ও সামিহা নওশীন।
গ্রন্থের প্রবন্ধগুলোতে ঢাকার রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্মৃতির দ্বন্দ্ব, ছাত্র আন্দোলন, উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন, অনানুষ্ঠানিক নগরায়ণ, জনপরিসর, জেনেভা ক্যাম্পের মহররম, পথের খাবার, আবাসনের রূপান্তর, শিশু ও তরুণবান্ধব নগর এবং দক্ষিণ এশিয়ার নির্মিত পরিবেশ নিয়ে নানা আলোচনা স্থান পেয়েছে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নবনীতা ইসলাম। তাঁর সাবলীল ও পরিমিত সঞ্চালনায় পুরো আয়োজনটি প্রাণবন্ত ও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে।
আলোচকেরা বলেন, ঢাকাকে শুধু বিশৃঙ্খলা, যানজট, জনঘনত্ব বা অবকাঠামোগত সংকটের শহর হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ বাস্তবতা ধরা পড়ে না। সম্পর্ক, সামাজিক নেটওয়ার্ক, সাংস্কৃতিক চর্চা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং প্রতিদিনের অভিযোজনও এই শহরকে সচল রাখে।
তাঁদের মতে, গ্রন্থের শিরোনামে ব্যবহৃত ‘বিশৃঙ্খলা’ ও ‘সংহতি’ পরস্পরের বিপরীত দুটি অবস্থা নয়। বরং এই দুইয়ের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই ঢাকা প্রতিনিয়ত ভাঙে, বদলায় এবং নতুনভাবে গড়ে ওঠে।
অনুষ্ঠান আয়োজন ও আতিথেয়তার জন্য বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগকে ধন্যবাদ জানান সম্পাদক ও আয়োজকেরা। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানানো হয় বিভাগের প্রধান অধ্যাপক নাজমুল ইমামকে। প্রধান অতিথি শিরীন পারভীন হক, সঞ্চালক নবনীতা ইসলাম, উপস্থিত লেখক, গবেষক, শিক্ষক, স্থপতি, শিক্ষার্থী ও অতিথিদের প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
সাউথ এশিয়ান কালচারাল স্টাডিজ–এর ২০ বছর পূর্তিতে প্রকাশিত এ গ্রন্থের উদ্বোধন একটি দীর্ঘ সম্মিলিত উদ্যোগের সমাপ্তি হলেও, একই সঙ্গে এটি ঢাকা নিয়ে নতুন আলোচনা ও গবেষণার সূচনা বলেও মনে করছেন আয়োজকেরা।