'হারিয়ে যাওয়া জোনাকির আলো'-পর্ব-২২

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৭-০৭ ১১:৫৩:৫০
image

পর্ব-২২-এ আমরা শুধু একটি গল্প বলব না,বরং শিশুদের কাছে আলো, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের একটি সুন্দর বার্তা পৌঁছে দেব। 

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী

সন্ধ্যা নেমেছে। পশ্চিম আকাশে শেষ আলোটুকুও মিলিয়ে যাচ্ছে। রাহি, অরণ আর শিসু গ্রামের মাঠ পেরিয়ে সেই পুরোনো আমবাগানের দিকে হাঁটছে।

শিসু হঠাৎ থেমে চারদিকে তাকিয়ে বলল,
-রাহি, মনে আছে? গত বছর এই সময় পুরো বাগান জোনাকির আলোয় ঝলমল করত। আজ একটাও দেখা যাচ্ছে না কেন?

রাহিও অবাক। সত্যিই তো! চারদিক নিস্তব্ধ। বাতাসে কদমফুলের গন্ধ আছে, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আছে, কিন্তু জোনাকির সেই মায়াবী আলো নেই।

ঠিক তখনই বটদাদুর কণ্ঠ ভেসে এলো-
-তোমরা যা খুঁজছ, তা শুধু একটি পোকা নয়; প্রকৃতির একটি ভাষা।

অরণ জিজ্ঞেস করল,
-ভাষা? জোনাকি আবার কথা বলে?

বটদাদু মৃদু হেসে বললেন,
-তাদের আলোই তাদের ভাষা। সেই আলো দিয়েই তারা একে অপরকে খুঁজে পায়, সঙ্গী ডাকে, জীবনচক্র এগিয়ে নিয়ে যায়।

পরদিন চারজন বেরিয়ে পড়ল রহস্যের খোঁজে।

আমবাগানের পাশে এখন নতুন কয়েকটি উজ্জ্বল বাতি লাগানো হয়েছে। রাতভর সেগুলো জ্বলতে থাকে। পাশের জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকও ব্যবহার হচ্ছে।

শিসু বলল,
-তাহলে কি এত আলোতেই জোনাকিরা হারিয়ে গেছে?

বটদাদু মাথা নেড়ে বললেন,
-কৃত্রিম আলোর অতিরিক্ত ব্যবহার আর নির্বিচারে কীটনাশক-দুটোই জোনাকিদের জন্য বড় বিপদ। যখন রাত আর সত্যিকারের অন্ধকার থাকে না, তখন তারা নিজেদের আলো দিয়ে একে অপরকে খুঁজে পায় না।

রাহি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
-তাহলে শুধু গাছ লাগালেই হবে না। প্রকৃতির রাতকেও বাঁচাতে হবে।

সেদিনই তারা গ্রামের মানুষদের নিয়ে একটি ছোট সভা করল। সবাই মিলে ঠিক করল-

প্রয়োজন ছাড়া সারারাত বাইরের তীব্র বাতি জ্বালিয়ে রাখা হবে না। কৃষকেরা কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকবেন। আমবাগানের একাংশকে 'নীরব সবুজ এলাকা' হিসেবে রাখা হবে, যেখানে অকারণে আলো জ্বালানো হবে না।

কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।

এক সন্ধ্যায় রাহি আবার সেই আমবাগানে গেল।

হঠাৎ-

একটি ছোট্ট আলো!

তারপর আরেকটি।

তারপর আরও দশটি...

মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার বাগান ভরে উঠল শত শত জোনাকির মিটমিটে আলোয়।

শিসু আনন্দে চিৎকার করে উঠল,
-ওরা ফিরে এসেছে! ওরা আমাদের ওপর রাগ করেনি!

অরণ হাসল।
-প্রকৃতি কখনো প্রতিশোধ নিতে চায় না। আমরা তাকে একটু যত্ন দিলে,সে আবার ফিরে আসে।

বটদাদু আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন,
-মনে রেখো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর আলো সব সময় বিদ্যুতের বাতি থেকে আসে না। কখনো কখনো একটি ছোট্ট জোনাকিও মানুষকে আশা দেখাতে পারে।

রাহি, অরণ আর শিসু হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তাদের সামনে জ্বলজ্বল করছে অসংখ্য ক্ষুদ্র আলো-যেন প্রকৃতি নিজেই বলছে, 'যারা আমাকে ভালোবাসে,আমি তাদের কাছে আবার ফিরে আসি।'

আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি প্রয়োজন ছাড়া অকারণে আলো জ্বালিয়ে রাখব না,পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন করব এবং ছোট প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখতে সচেতন থাকব।

সবুজ তথ্যঃ
জোনাকি হলো উপকারী পতঙ্গ। অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো,বাসস্থান ধ্বংস এবং নির্বিচারে কীটনাশকের ব্যবহার তাদের সংখ্যা কমিয়ে দেয়। জোনাকি থাকা মানে পরিবেশ এখনো তুলনামূলকভাবে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ।

পর্ব-২৩
শেষ প্রজাপতির ডাক