রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে তাঁর স্বাভাবিক যোগাযোগ অক্ষুণ্ন রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমনভাবে পরিচালিত হতে হবে যাতে সরকারপ্রধানকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না হয়।
রোববার দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর)-এর ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের আস্থা ও ভালোবাসাই সরকারের প্রধান শক্তি। তাই নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় এমন ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, যাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরকারপ্রধানের সম্পর্ক ও যোগাযোগে কোনো দূরত্ব সৃষ্টি না হয়।
তিনি বলেন, পিজিআরে দায়িত্ব পালনের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্য থেকে বিশেষভাবে নির্বাচিত ও প্রশিক্ষিত সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে এই বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের মধ্যে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা, আনুগত্য ও দায়িত্ববোধের সর্বোচ্চ মান বজায় থাকবে-এটাই প্রত্যাশিত। তাঁদের কর্মদক্ষতা ও নিষ্ঠার মধ্য দিয়েই বাহিনীর মর্যাদা আরও সুদৃঢ় হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার দায়িত্বও পিজিআরকে পালন করতে হয়। নানা ধরনের প্রতিকূল ও জটিল পরিস্থিতিতে এসব দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করে বাহিনীটি বিশ্বস্ত ও সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়েছে।
তিনি জানান, সুশৃঙ্খলতা ও পেশাগত উৎকর্ষের স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছরে পিজিআর ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। এ অর্জনের জন্য বাহিনীর সব সদস্যকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তাঁদের দৃঢ় দায়িত্ববোধ প্রশংসার দাবি রাখে।
সশস্ত্র বাহিনীকে দেশের সাহস, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব বজায় থাকলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কখনো হুমকির মুখে পড়বে না বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পিজিআরের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আধুনিক নিরাপত্তা কৌশল, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সাহস, সততা, বিশ্বস্ততা, নিয়মানুবর্তিতা এবং নির্দেশনার ধারাবাহিকতা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। একটি বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সাইবার যুদ্ধ, ড্রোনভিত্তিক হামলা, তথ্যযুদ্ধ এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মতো নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু পিজিআর নয়, দেশের প্রতিটি বাহিনীকে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সক্ষমতায় প্রস্তুত থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি পিজিআর ও স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর আধুনিকায়নে সরকার ইতোমধ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষী ইউনিট’ গঠন করা হয়। পরে একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ইউনিটটির নাম পরিবর্তন করে ‘প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট’ রাখেন, যা বাহিনীর কার্যক্রমকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর করে।
প্রধানমন্ত্রী ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের ঘটনাও স্মরণ করেন। তিনি ওই সময় কর্তব্যরত অবস্থায় শহীদ হওয়া পিজিআরের পাঁচ সদস্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের নিরাপত্তায় জীবন উৎসর্গের যে অনন্য দৃষ্টান্ত তাঁরা স্থাপন করেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী কেক কেটে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্বোধন করেন এবং পিজিআর সদর দপ্তর প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে তিনি চট্টগ্রামে শহীদ হওয়া পাঁচ পিজিআর সদস্যের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাঁদের খোঁজখবর নেন।
প্রতি বছরের ৫ জুলাই প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় প্রটোকল নিশ্চিত করতে গঠিত এই বিশেষায়িত ইউনিট বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অধীনে দায়িত্ব পালন করছে। দিবসটি উপলক্ষে পিজিআর সদর দপ্তরে বার্ষিক দরবার, কুচকাওয়াজসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
পিজিআর, তারেক রহমান, নিরাপত্তা