বিদেশের মাটিতে দিনের পর দিন ঘাম ঝরিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন প্রবাসীরা। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে বদলে যাচ্ছে পরিবারের ভাগ্য, নির্মিত হচ্ছে ঘরবাড়ি, চলছে সন্তানের পড়াশোনা, টিকে আছে দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহ। কিন্তু সেই প্রবাসীদের জীবনের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ নীরব ট্র্যাজেডি।
অর্থ উপার্জনের জন্য পরিবার ছেড়ে বিদেশে যাওয়া বহু মানুষ দেশে ফিরে পাচ্ছেন ভাঙ্গা সংসার,সম্পর্কের বিশ্বাসঘাতকতা এবং অবহেলিত সন্তানদের দীর্ঘশ্বাস।
কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে, প্রবাসী পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজ বিশ্লেষক ও সচেতন মহলের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক বাস্তবতা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রীর দূরত্ব, সামাজিক অবক্ষয়, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং নৈতিক মূল্যবোধের সংকটের কারণে অনেক প্রবাসী পরিবারে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ অস্থিরতা।
স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ,বাস্তবে নির্মম সংগ্রাম অধিকাংশ প্রবাসীর বিদেশযাত্রা শুরু হয় দারিদ্র্য ও সীমাহীন
কষ্ট থেকে মুক্তির আশায়।
কেউ কৃষকের সন্তান,কেউ দিনমজুর পরিবারের একমাত্র ভরসা, আবার কেউ সংসারের অভাব ঘোচাতে ধারদেনা করে বিদেশে যান।
মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুভূমি, মালয়েশিয়ার কারখানা কিংবা ইউরোপের কঠিন শ্রমবাজারে অমানবিক পরিশ্রম করে তারা। দিনের পর দিন অতিরিক্ত কাজ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে। তবুও তারা মুখে হাসি ধরে রাখেন শুধু পরিবারের সুখের আশায়।
অনেক প্রবাসী জানান, নিজেরা কষ্টে থাকলেও পরিবারকে কখনো অভাব বুঝতে দেন না। নিয়মিত টাকা পাঠিয়ে স্ত্রী-সন্তান,মা-বাবা এবং আত্মীয়স্বজনের চাহিদা পূরণ করেন। কিন্তু সেই ত্যাগের বিনিময়ে অনেকেই পাচ্ছেন না ভালোবাসা ও বিশ্বস্ততা।
দেশে ফিরে ভাঙ্গা সংসারের নির্মম বাস্তবতা-অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার সুযোগে কিছু পরিবারে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে।
কোথাও পরকীয়ার অভিযোগ, কোথাও সম্পত্তি আত্মসাৎ, আবার কোথাও সন্তানদের প্রতি চরম অবহেলার চিত্র মিলেছে।
বিভিন্ন এলাকার স্থানীয়রা জানান, বিদেশে থাকা স্বামীর পাঠানো অর্থে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হলেও কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ায় নৈতিক অবক্ষয় বাড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সম্পর্ক এবং স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তির প্রভাব সংসারে অস্থিরতা তৈরি করছে।
একাধিক প্রবাসী অভিযোগ করেন, বছরের পর বছর কষ্টার্জিত অর্থ পাঠানোর পর দেশে ফিরে দেখেছেন স্ত্রী অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন।
কেউ দেখেছেন নিজের সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, আবার কেউ আবিষ্কার করেছেন তাদের অনুপস্থিতিতে পারিবারিক সম্পদও হাতছাড়া হয়ে গেছে।
একজন প্রবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,“বিদেশে থাকাকালে প্রতিদিন শুধু পরিবারের কথা ভেবেছি।
নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে টাকা পাঠিয়েছি। কিন্তু দেশে ফিরে দেখি আমার সন্তান অবহেলিত, সংসার ভেঙ্গে গেছে। তখন মনে হয়েছে জীবনের সব পরিশ্রম যেন বৃথা।”অবহেলিত হয়ে পড়ছে সন্তানরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সন্তানরা। বাবা বিদেশে, মা ব্যস্ত নিজস্ব জীবনে ফলে শিশুরা অনেক সময় সঠিক পারিবারিক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক সন্তান মানসিক অস্থিরতা, হতাশা ও একাকীত্বে ভুগছে। শিক্ষকদের মতে, পরিবারে অশান্তি ও অভিভাবকের অনুপস্থিতির কারণে অনেক শিশুর পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কেউ কেউ মাদক, কিশোর গ্যাং কিংবা অপরাধপ্রবণ কর্মকাণ্ডের দিকেও ঝুঁকে পড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি শিশুর মানসিক বিকাশে বাবা-মায়ের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে দীর্ঘ অনুপস্থিতি ও পারিবারিক ভাঙন শিশুর ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রযুক্তি ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভার্চুয়াল সম্পর্ক,গোপন যোগাযোগ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব সম্পর্কের ভাঙনকে ত্বরান্বিত করছে।
সচেতন মহলের মতে, আগে পরিবার ও সমাজের যে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল, এখন তা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সম্পর্কের প্রতি দায়িত্ববোধ কমছে এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারা বাড়ছে। নীরবে ভেঙে পড়ছেন প্রবাসীরা,
বিদেশে থাকা বহু প্রবাসী চরম মানসিক চাপের মধ্যে জীবনযাপন করেন। একদিকে কঠোর শ্রম, অন্যদিকে পরিবার হারানোর ভয় সব মিলিয়ে তারা ভেতরে ভেতরে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
অনেকে জানান, পরিবারের সুখের জন্য নিজের আবেগ ও কষ্ট চেপে রাখলেও বিশ্বাসভঙ্গের খবর তাদের মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। কেউ হতাশায় আক্রান্ত হন, কেউ দীর্ঘদিন মানসিক যন্ত্রণায়
ভোগেন। এমনকি অনেক প্রবাসী দেশে ফিরেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতামত-সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অর্থ উপার্জন নয়, পরিবার টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন পারস্পরিক বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক মূল্যবোধ চর্চা। তাদের মতে প্রবাসী পরিবারগুলোর জন্য কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। সন্তানদের মানসিক বিকাশে পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে। সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জোরদার করতে হবে।
প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে পারিবারিক নজরদারি প্রয়োজন। প্রবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও রাষ্ট্রীয় ভাবে ভাবতে হবে।
অর্থনীতির নেপথ্যের চাপা কান্না,দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের উন্নয়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। অথচ সেই প্রবাসীদের অনেকেই আজ নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও পরিবার ভাঙনের কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন নীরবে।
প্রবাসীদের ঘামঝরা শ্রমের পেছনে শুধু অর্থের গল্প নেই; সেখানে লুকিয়ে আছে হাজারো ত্যাগ, অপূর্ণতা, দীর্ঘশ্বাস ও না বলা কান্না। সমাজ যদি এখনই এই সংকটের দিকে গুরুত্ব না দেয়, তবে ভবিষ্যতে এর সামাজিক প্রভাব আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। অর্থ দিয়ে হয়তো ঘর তৈরি করা যায়, কিন্তু ভালোবাসা, বিশ্বাস ও পারিবারিক বন্ধন ছাড়া একটি পরিবার কখনো পূর্ণতা পায় না প্রবাস জীবনের অসংখ্য ভাঙা সংসার যেন আজ সেই নির্মম সত্যেরই সাক্ষ্য বহন করছে।
মহেশখালী (কক্সবাজার)