ডুমুরিয়া (খুলনা):
বসতবাড়ির পরিত্যক্ত আঙিনাকে কাজে লাগিয়ে বেগুনের বাম্পার ফলন ঘটিয়েছেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার এক সফল খামারী। বাড়ির আনাচে-কানাচে পড়ে থাকা সামান্য জায়গাকে সবুজ ও বেগুনী রঙে রাঙিয়ে তুলে একদিকে যেমন পরিবারের পুষ্টি ও সবজির চাহিদা মেটাচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।
ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগটি নিয়েছেন ডুমুরিয়া উপজেলার গ্রামের জামাল গাজীর ছেলে খান জাহান আলী। পেশায় একজন সরকারি চাকুরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও মাটির টানে এবং ভেজালমুক্ত সবজি খাওয়ার তাগিদে তিনি এই পথ বেছে নিয়েছেন।
চাকুরির পাশাপাশি অনন্য উদ্যোগ-সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, খান জাহান আলীর বাড়ির আঙিনায় থোকায় থোকায় ঝুলছে বেগুন। চাকুরির ব্যস্ততা সামলে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা তিনি নিজেই এই বাগানের পরিচর্যা করেন। খান জাহান আলী জানান: "বাজারের রাসায়নিক ও কীটনাশকযুক্ত সবজি কিনে খাওয়ার চেয়ে বিষমুক্ত ফ্রেশ সবজি উৎপাদনের চিন্তা থেকেই আমি বাড়ির আঙিনায় বেগুন চাষ শুরু করি। এখন নিজের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদেরও দিতে পারছি। এতে যেমন মানসিক তৃপ্তি মেলে, তেমনি বাজারের খরচও অনেক সাশ্রয় হচ্ছে।"
কৃষির আধুনিকায়ন ও মাঠপর্যায়ের চিত্র: উপজেলা কৃষি অফিসারের বিশেষ সাক্ষাৎকার
খান জাহান আলীর এই পারিবারিক কৃষি বিপ্লব এবং ডুমুরিয়ায় এর সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে কথা বলেছেন ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ নাজমুল হুদ।
প্রশ্ন: খান জাহান আলীর এই পারিবারিক বেগুন চাষের উদ্যোগটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
কৃষিবিদ নাজমুল হুদা: দেখুন, এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার বলছেন, 'এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদী না থাকে'। খান জাহান আলী সাহেব সরকারি চাকুরির পাশাপাশি তার বাড়ির আঙিনাকে যেভাবে কাজে লাগিয়েছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের খাদ্য নিজে উৎপাদন করা সম্ভব।
প্রশ্ন: ডুমুরিয়া অঞ্চলে বাড়ির আঙিনায় বা বসতবাড়ির আশেপাশে সবজি চাষের সম্ভাবনা কেমন?
কৃষিবিদ নাজমুল হুদা: ডুমুরিয়ার মাটি ও জলবায়ু সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উর্বর। বিশেষ করে বেগুন, মরিচ, টমেটো বা লাউয়ের মতো সবজিগুলো বাড়ির আঙিনায় সামান্য যত্নেই চমৎকার ফলন দেয়। আমরা উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে 'পারিবারিক পুষ্টি বাগান' প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের নিয়মিত উদ্বুদ্ধ করছি। খান জাহান আলীর মতো শৌখিন ও সচেতন চাষীদের এই সাফল্য দেখে এখন আশেপাশের অনেকেই উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।
প্রশ্ন: বেগুন চাষে সাধারণত কী ধরনের রোগবালাই হয় এবং আপনারা কী পরামর্শ দিচ্ছেন?
কৃষিবিদ নাজমুল হুদা: বেগুনে প্রধানত ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ বেশি দেখা যায়। তবে আমরা ডুমুরিয়ায় রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে চাষাবাদের পরামর্শ দিচ্ছি। সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে এবং জৈব বালাইনাশক প্রয়োগ করে পোকা দমন করা সম্ভব। এতে সবজিটি সম্পূর্ণ বিষমুক্ত এবং স্বাস্থ্যের জন্য শতভাগ নিরাপদ থাকে।
প্রশ্ন: ডুমুরিয়ার অন্যান্য সাধারণ মানুষ যারা এভাবে সবজি চাষ করতে চান, তাদের জন্য আপনাদের বার্তা কী?
কৃষিবিদ নাজমুল হুদা: আমাদের বার্তা পরিষ্কার—আপনার বাড়ির আশেপাশে, ছাদে বা আঙিনায় যেটুকুই খালি জায়গা আছে, তাকে অবহেলায় ফেলে রাখবেন না। পুষ্টির চাহিদা মেটাতে সবজি চাষ শুরু করুন। ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি অফিস সবসময় বীজ, সার, আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক পরামর্শ নিয়ে আপনাদের পাশে আছে। আমরা চাই ডুমুরিয়ার প্রতিটি বাড়ি একেকটি মিনি কৃষি খামারে পরিণত হোক।
অনুকরণীয় দৃষ্টান্তঃ
খান জাহান আলীর এই বেগুন চাষের সাফল্য ডুমুরিয়া উপজেলার অন্যান্য গ্রামীণ যুবকদের মাঝেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। স্থানীয় বাসিন্দা রস্তোম আমি,ও মাহাবুবুর রহমান জানান, চাকুরির পাশাপাশি এমন উৎপাদনমুখী কাজ সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। সঠিক তদারকি ও সরকারি সহযোগিতা পেলে ডুমুরিয়ার এই পারিবারিক পুষ্টি বাগান মডেল পুরো জেলাতেই পুষ্টির ঘাটতি পূরণেবড় ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।