সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে পুলিশের সাফল্য,পরে অপপ্রচার দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়ায় বাড়ছে অপরাধের ঝুঁকি

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৬-৩০ ২১:৫৮:০৪
image

মহেশখালী (কক্সবাজার) 
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাস, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান অভিযানে  একদিকে  যেমন  সাধারণ   মানুষের  মাঝে স্বস্তি ফিরছে, অন্যদিকে  এসব অভিযানকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে বিতর্ক,অপপ্রচার,দ্বিমুখী সামাজিক প্রতিক্রিয়া। 
সংশ্লিষ্টদের  মতে, একটি  স্বার্থান্বেষী  মহল  পরিকল্পিত ভাবে পুলিশের সফল অভিযান ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাস্তবধর্মী  সংবাদকে  প্রশ্নবিদ্ধ  করার  চেষ্টা করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে  অপরাধ  নিয়ন্ত্রণ  ব্যবস্থাকে   দুর্বল   করে দিচ্ছে।
তথ্য  অনুসন্ধানে  জানা  যায়, দেশের  বিভিন্ন  থানা ও পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অভিযান   পরিচালনা   করছেন।  গভীর   রাত  কিংবা দুর্গম  এলাকায়  পরিচালিত  এসব   অভিযানে  উদ্ধার হচ্ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র,দেশীয় অস্ত্র, মাদক ও অপরাধে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও অপরাধচক্রের সদস্যদের। 
পরে   তাদের   বিরুদ্ধে   আইনগত  ব্যবস্থা  গ্রহণ করে আদালতের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা  বাহিনীর  কর্মকর্তারা  বলছেন, সাধারণ মানুষের   জানমালের   নিরাপত্তা   নিশ্চিত  করা এবং এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখাই এসব অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।  অনেক  এলাকায়  দীর্ঘদিন  ধরে  সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি,দখলবাজি ও অস্ত্রের মহড়ায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত থাকলেও ভয়ের কারণে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে পারেন না। তবে পুলিশি অভিযানে অপরাধীরা গ্রেপ্তার হলে স্থানীয় জনগণের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে।
অভিযান-পরবর্তী   সময়ে   সমাজের   একটি  অংশ পুলিশের   সাহসী  ভূমিকার  প্রকাশ্যে  প্রশংসা করে। সামাজিক  যোগাযোগমাধ্যম,  স্থানীয়   সভা  কিংবা সাধারণ আলোচনায় পুলিশ সদস্যদের সাহসিকতার কথা উঠে আসে। 
একই সঙ্গে দায়িত্বশীল সাংবাদিকরা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ  করে ঘটনার  বাস্তব চিত্র তুলে ধরলে সচেতন মহল তাদের প্রশংসা করে এবং অপরাধ দমনে এমন সাংবাদিকতাকে  গুরুত্বপূর্ণ  ভূমিকা  হিসেবে দেখেন।
তবে ঘটনার বিপরীত চিত্রও কম নয়। 
গত ২৮  জুন  গভীর রাতে  কালারমারছড়া  পুলিশ  ক্যামাপের  ইনচার্জ এসআই রাজু আহমেদ গাজীর নেতৃত্বে সফল অভিযান দেশীয় অস্ত্র ও কার্তুজসহ আটক ২
মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা ইউনিয়নের বধুয়ার ঘাট  বিএনপি ঘোনা’  নামক  একটি   চিংড়ি   ঘেরে অভিযান চালিয়ে দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। 
এসময়  তাদের  দেওয়া তথ্যমতে একটি দেশীয় তৈরি এলজি,একটি একনলা বন্দুক ও দুইটি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে।  পুলিশের দাবি, সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে   চলমান  অভিযানের   অংশ    হিসেবেই  এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়,মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)  মোঃ   সুলতানের     দিকনির্দেশনায় কালারমারছড়া  পুলিশ  ক্যাম্পের  ইনচার্জ এসআই রাজু  আহমেদ  গাজীর  নেতৃত্বে   মহেশখালী   থানা পুলিশের একটি চৌকস দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানটি পরিচালিত হয় ২৮ জুন ২০২৬ রাত ১১টা ৫০  মিনিটে  ধলঘাটা  ইউনিয়নের  ০৫ নম্বর ওয়ার্ডের সিকদারপাড়া  এলাকার ‘বধুয়ার ঘাট  বিএনপি ঘোনা’ নামক একটি চিংড়ি ঘেরে। অভিযানের সময় ঘটনাস্থল থেকে  কালারমারছড়া  ইউনিয়নের ০৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউনুসখালী এলাকার  মোঃ  ইসমাইলের  ছেলে হালিম মোহাম্মদ মিজবা (২৫) এবং একই এলাকার মৃত ফরিদ আলমের   ছেলে  শাহাদাৎ   হোসেন  রিফাত  (২৭) কে আটক করা হয়।
পরে  আটককৃতদের  দেওয়া তথ্যের  ভিত্তিতে পুলিশ চিংড়ি ঘের সংলগ্ন একটি সেমিপাকা ঘরের উত্তরমুখী কক্ষে তল্লাশি চালায়।  এসময়  সেখান  থেকে  একটি দেশীয়  তৈরি  এলজি, একটি  দেশীয়  তৈরি একনলা বন্দুক এবং দুইটি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলো জব্দ করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
একটি পক্ষ প্রায়ই অস্ত্র উদ্ধার ও আটকের ঘটনাকে “সাজানো  নাটক” দাবি  করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে   অপপ্রচার   শুরু করে।  কোথাও  কোথাও মানববন্ধন,বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি প্রদানের ঘটনাও ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে  সাধারণ  মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়।
স্থানীয়  সূত্রগুলোর  দাবি,অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি,গোষ্ঠী কিংবা  রাজনৈতিক  স্বার্থে  সংঘবদ্ধভাবে এ ধরনের তৎপরতা  পরিচালিত  হয়।   প্রকৃত   ঘটনা সম্পর্কে অবগত  থাকার  পরও  কিছু  মানুষ নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় পুলিশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এতে ১ জন দায়িত্বশীল ও সাহসী কর্মকর্তা প্রশাসনিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়েন।
সংশ্লিষ্ট   মহলের  অভিযোগ,  অপপ্রচার  ও  বিতর্কের কারণে  অনেক  সময়  কার্যকর  ভূমিকা   পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলিও করা হয়। পরে দেখা যায়, যেসব   এলাকায়   কঠোর  অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল,  সেখানে   আবারও  সন্ত্রাসী  কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে।  অস্ত্রধারীরা   সক্রিয়   হয়ে   উঠছে,  বাড়ছে চাঁদাবাজি, দখল ও সহিংসতা।  ফলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করছে।
স্থানীয়   বাসিন্দাদের   মতে,  কঠোর   অবস্থানে  থাকা কোনো কর্মকর্তা বদলি হওয়ার পর অপরাধীরা সুযোগ নিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। ধীরে ধীরে পুরো এলাকা সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে  চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়।
অন্যদিকে, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাই করে  সংবাদ  প্রকাশের  পরও  অনেক সাংবাদিককে “অপপ্রচারকারী”    “পক্ষপাতদুষ্ট ”কিংবা   “উদ্দেশ্য প্রণোদিত সংবাদকর্মী” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অথচ পরবর্তীতে সময়ই প্রমাণ করে দেয় যে প্রকাশিত সংবাদ  বাস্তবতার  ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গণমাধ্যম দুইটিই রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সন্ত্রাস  ও  অপরাধ দমনে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা যেমন প্রয়োজন,তেমনি সত্য ও বাস্তবতা তুলে ধরতে দায়িত্বশীল  সাংবাদিকতাও  অত্যন্ত জরুরি।
কোনো ঘটনার প্রকৃত সত্য যাচাই না করে উদ্দেশ্য প্রণোদিত  অপপ্রচার  চালানো  হলে  তা  সমাজে নেতিবাচক   প্রভাব   ফেলে  এবং   অপরাধীদের 
উৎসাহিত করে।
তাদের মতে, সমাজের   সচেতন   অংশকে   গুজব ও বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবতা অনুধাবন করতে হবে। 
একই  সঙ্গে  সন্ত্রাস ও অপরাধ দমনে সাহসী ভূমিকা পালনকারী পুলিশ সদস্য এবং সত্য প্রকাশে দায়বদ্ধ সাংবাদিকদের    যথাযথ    মূল্যায়ন   নিশ্চিত  করা প্রয়োজন। 
অন্যথায় অপপ্রচার ও বিভ্রান্তির সুযোগে অপরাধচক্র আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং সাধারণ মানুষকেই এর চরম মূল্য দিতে হবে।