মাদকের অন্ধকার থেকে তারুণ্যকে বাঁচাতে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৬-২৭ ১৫:৪৮:১১
image

প্রতি বছর ২৬ জুন পালিত হয় 'মাদক দ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস'। দিবসটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পালন নয়; এটি বিশ্ববাসীকে একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। মাদক শুধু একটি অবৈধ দ্রব্য নয়,এটি ব্যক্তি,পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের অন্যতম ভয়ংকর অস্ত্র। বিশেষ করে তরুণ সমাজ যখন মাদকের জালে আটকা পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি দেশের মানবসম্পদ,অর্থনীতি,সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের সম্ভাবনা।

বিশ্বব্যাপী মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবহার করছে এবং প্রতিবছর নতুন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। কৃত্রিম বা সিনথেটিক মাদক,মেথামফেটামিন,ফেন্টানিল, কোকেন,হেরোইন এবং নতুন নতুন সাইকোঅ্যাকটিভ পদার্থ আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম,এনক্রিপটেড যোগাযোগব্যবস্থা এবং অনলাইন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মাদক পাচারকারীরা তাদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করছে। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণ এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়;এটি একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন মাদকপাচার রুটের কাছাকাছি থাকায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা,আইস,গাঁজা,হাসিস, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদকের অনুপ্রবেশ রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও চোরাচালানকারীরা নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করছে। শুধু পাচার নয়,উদ্বেগের বিষয় হলো দেশে মাদকের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও বেড়েছে। শহর থেকে গ্রাম,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কর্মস্থল-অনেক জায়গাতেই মাদক ছড়িয়ে পড়ার নানা তথ্য সামনে আসে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো তরুণ ও কিশোর সমাজ। কৌতূহল,বন্ধুবান্ধবের প্ররোচনা,মানসিক চাপ,হতাশা,বেকারত্ব,পারিবারিক অস্থিরতা কিংবা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা-এসব কারণে অনেক তরুণ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। প্রথমে 'একবার চেষ্টা' হিসেবে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভয়াবহ আসক্তিতে রূপ নেয়। এরপর শিক্ষা,কর্মজীবন,পরিবার,সামাজিক সম্পর্ক-সবকিছু ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্তি থেকে চুরি,ছিনতাই,সহিংসতা,সন্ত্রাস,এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধও সংঘটিত হয়।
মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইকে কেবল গ্রেপ্তার ও শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত,মানবিক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
প্রথমত,পরিবারকে হতে হবে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা। সন্তানের আচরণ,বন্ধুবান্ধব,অনলাইন কার্যক্রম এবং মানসিক অবস্থার প্রতি অভিভাবকদের সচেতন নজর রাখতে হবে। ভালোবাসা,পারস্পরিক আস্থা ও খোলামেলা যোগাযোগ অনেক ক্ষেত্রে মাদকের প্রাথমিক ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু পাঠদান নয়,জীবনদক্ষতা ও মূল্যবোধ গঠনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যালয়,কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম, কাউন্সেলিং,খেলাধুলা,সাংস্কৃতিক চর্চা এবং স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে। একজন ব্যস্ত,সৃজনশীল ও আত্মবিশ্বাসী তরুণের মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।
তৃতীয়ত, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও সহজলভ্য করতে হবে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে চলবে না; অনেক ক্ষেত্রেই তিনি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনেরও দাবিদার। দক্ষ চিকিৎসক,মনোরোগ বিশেষজ্ঞ,কাউন্সেলর এবং পুনর্বাসনকেন্দ্রের সংখ্যা ও মান বাড়াতে হবে, যাতে সুস্থ জীবনে ফিরে আসার বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়।
চতুর্থত,সীমান্ত নিরাপত্তা,গোয়েন্দা নজরদারি,আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অর্থপাচার প্রতিরোধে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। মাদক ব্যবসার মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অবৈধ অর্থের উৎস শনাক্ত ও বন্ধ করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি,তথ্য বিনিময় এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া এই লড়াই সফল হবে না।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক আন্দোলন। মাদকবিরোধী লড়াই কোনো একক সংস্থা বা সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান,গণমাধ্যম,সাংস্কৃতিক সংগঠন, ক্রীড়া সংগঠন,সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণদের সামনে এমন একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে হবে,যেখানে তারা স্বপ্ন দেখবে,দক্ষতা অর্জন করবে এবং দেশ গড়ার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করবে।
একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ প্রজন্ম। সেই সম্পদ যদি মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তবে উন্নয়ন, অর্থনীতি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কোনো কিছুই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তাই ২৬ জুনের এই দিবস আমাদের শুধু সচেতন হওয়ার আহ্বান জানায় না; এটি আমাদের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। পরিবার, শিক্ষা, আইন, চিকিৎসা এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমেই একটি মাদকমুক্ত, সুস্থ ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম আলোর পথে এগোবে,নাকি মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।

লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট।