সালাম মাহমুদ: কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মসজিদে নামাজ আদায় করতে গিয়ে জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে চরম বিপাকে পড়েছিলেন প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক মো. মোশাররফ হোসেন (৬১)। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানো এই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন ব্যাটারিচালিত ভ্যান উপহার দিয়েছেন হামদর্দ ল্যাবরেটরীজ (ওয়াক্ফ) বাংলাদেশ-এর সিনিয়র পরিচালক (উন্নয়ন, পরিকল্পনা এবং বিক্রয় ও বিপণন) অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন।
একাধিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোশাররফ হোসেনের অসহায়ত্বের সংবাদ প্রকাশিত হলে তা অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুনের দৃষ্টিগোচর হয়। সংবাদটি দেখেই তিনি নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবী টিমের মাধ্যমে মোশাররফের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেন। পরে ব্যক্তিগত অর্থায়নে তার জন্য একটি নতুন ব্যাটারিচালিত ভ্যানের ব্যবস্থা করেন।
রবিবার (১৪ জুন) কুমারখালী উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে মোশাররফ হোসেনের হাতে ভ্যানটি হস্তান্তর করা হয়। এ সময় কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারজানা আখতার, সাপ্তাহিক খোঁজখবর-এর নির্বাহী সম্পাদক তকীউদ্দিন মুহাম্মদ আকরামুল্লাহ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
নতুন ভ্যান পেয়ে আবেগাপ্লুত মোশাররফ হোসেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “ভ্যান হারানোর পর আমি যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। কীভাবে সংসার চলবে, পরিবারকে কীভাবে খাবার দেব—সেই চিন্তায় দিন কাটছিল। আল্লাহর অশেষ রহমতে আবার নতুন করে কাজ করার সুযোগ পেলাম। অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন ম্যাডামের জন্য আমি নিয়মিত মিলাদ পড়াবো এবং দোয়া করবো। আল্লাহ যেন তাকে উত্তম প্রতিদান দেন।”
জানা যায়, গত ২ জুন উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া বড় জামে মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করতে যান মোশাররফ হোসেন। মসজিদের বাইরে ভ্যান রেখে নামাজে অংশ নেন তিনি। নামাজ শেষে বের হয়ে দেখেন, তার জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ভ্যানটি চুরি হয়ে গেছে। সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও কোনো সন্ধান না পেয়ে তিনি কুমারখালী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
তিন বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মোশাররফের একটি পা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না তিনি। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে অন্য কোনো কাজ করার সুযোগও নেই। প্রতিদিন ভ্যান চালিয়ে যা আয় হতো, তা দিয়েই চলত তার বৃদ্ধ মা, অসুস্থ স্ত্রী এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভরণপোষণ। ফলে ভ্যানটি হারিয়ে যাওয়ার পর পুরো পরিবার মানবেতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।
মানুষের দুঃখ-কষ্টের খবর পেলেই সাধ্যমতো পাশে দাঁড়ানোর জন্য পরিচিত অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন এর আগেও অসংখ্য মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি পোস্টের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁওয়ের এক অসহায় পরিবারের জীবনসংগ্রামের খবর তার নজরে আসে। তিন শিশুসন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করা পরিবারটির সঠিক ঠিকানা পোস্টে উল্লেখ না থাকলেও নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবী টিমের মাধ্যমে তাদের খুঁজে বের করেন তিনি। পরে পরিবারটির জন্য একটি নতুন ঘর নির্মাণ, একটি দুধেল গরু এবং এক মাসের খাদ্যসামগ্রী উপহার দেন।
শুধু এ ঘটনাই নয়, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ, চিকিৎসা সহায়তা, শিক্ষা সহায়তা এবং পুনর্বাসনমূলক নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরেই মানবিক সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন। সমাজের প্রান্তিক মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার লক্ষ্যেই তিনি নিয়মিতভাবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে চলেছেন।
স্থানীয়দের মতে, নতুন ভ্যান পাওয়ায় মোশাররফ হোসেনের পরিবারে আবারও স্বস্তি ফিরেছে। হারিয়ে যাওয়া জীবিকার অবলম্বনের পরিবর্তে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে এই মানবিক সহায়তা। আর একজন অসহায় মানুষের মুখে ফিরে এসেছে বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন।