টাঙ্গাইলে স্বাধীনতার সাড়ে পাচ দশকেও হয়নি সেতু ২০ গ্রামের মানুষের ভরসা নড়বড়ে কাঠের সাকো

  • আব্দুস সাত্তার,প্রতিনিধি টাঙ্গাইল:
  • ২০২৬-০৬-১৫ ১৫:৫৮:৫৬
image

টাঙ্গাইলের বাসাইলের লাঙ্গুলিয়া নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। ফুলকি ইউনিয়নের খাটরা গ্রামে নির্মিত জরাজীর্ণ-ঝুকিপূর্ণ-নড়বড়ে কাঠের সাকোটিই এখন বাসাইল ও কালিহাতী এ দুই উপজেলার প্রায় ২০টি গ্রামের লাখো মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। প্রতিদিন চরম প্রাণঝুকি নিয়ে এই নড়বড়ে সাকো পার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও শ’ শ’ কোমলমতি শিক্ষার্থী। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বছরের পর বছর ধরে জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি শুনলেও বাস্তবে মেলেনি একটি টেকসই সেতু।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাসাইল উপজেলার ফুলকি, খাটরা, বল্লা, কাজিপুর এবং পাশের কালিহাতী উপজেলার রামপুর, গান্ধিনা, তেজপুরসহ প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষের উপজেলা সদরে পৌঁছানোর একমাত্র সহজ মাধ্যম এই পথটি। যাতায়াত ব্যবস্থা সচল রাখতে নিরুপায় হয়ে প্রায় ১২ বছর আগে এলাকাবাসী নিজেদের উদ্যোগে ও অর্থায়নে লাঙ্গুলিয়া নদীর ওপর এই কাঠের সাকোটি নির্মাণ করেন। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় বর্তমানে সাকোটির কাঠ ও খুটি পচে গিয়ে চরম বিপজ্জনক আকার ধারণ করেছে।
সরেজমিনে এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সাকোটি দিয়ে পায়ে হেটে যাতায়াত করাও এখন দুরুহ হয়ে পড়েছে। এর ওপর দিয়েই অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেলের মতো ছোট যানবাহনগুলো জীবনের ঝুকি নিয়ে চলাচল করছে। যেকোনো মুহূর্তে সাকোটি ভেঙে নদীতে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এই অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান, সবজি ও বিভিন্ন কাচামাল সময়মতো কাউলজানী বোর্ড বাজার বা উপজেলা সদরে নিতে পারছেন না। পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ ও চরম ভোগান্তির কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় প্রান্তিক চাষিরা। 
কাউলজানী বোর্ড বাজার এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লুৎফা-শান্তা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কাউলজানী নওশেরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় এবং একাধিক ব্যাংকের শাখা রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর শ’ শ’ শিক্ষার্থী ও গ্রাহকদের প্রতিদিন এই কাঠের সাকো পার হতে হয়। নড়বড়ে সাকো পার হতে গিয়ে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা পা পিছলে নদীতে পড়ে বই-খাতা ভিজিয়ে ফেলছে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কায় অভিভাবকরা সন্তানদের একা স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। 
এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, লাঙ্গুলিয়া নদীর এই স্থানের সেতু নির্মাণকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন জনপ্রতিনিধিরা। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত যতগুলো নির্বাচন এসেছে, প্রতিটি নির্বাচনেই বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা এই ঘাটে এসে পাকা বৃজ করে দেওয়ার গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু ভোট শেষ হয়ে গেলে আর এলাকার মানুষের খোজ নেন না। ফলে খাটরা গ্রামসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি কেবল প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। ভুক্তভোগী প্রায় ২০টি গ্রামের সাধারণ মানুষের জোর দাবি- হাজারো মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, শিক্ষার্থীদের নির্বিঘেœ চলাচল এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল করতে লাঙ্গুলিয়া নদীর ওপর অবিলম্বে একটি স্থায়ী ও পাকা সেতু। 
স্থানীয় বাসিন্দা হামেদ আলী মিয়া বলেন, ‘স্বাধীনতার পর অনেক এমপি আইলো-গেল, কেউ এই বৃজটি কইরা দেয় না। নির্বাচন আইলে কয়, এই বৃজ কইরা দিমু, নির্বাচন যাওয়ার পর আর মনে থাকে না। আমাদের এই বৃজটি খুবই দরকার। হাজার হাজার মানুষ নড়বড়ে  সাকো দিয়ে চলাচল করে থাকে।’ 
ব্যাটারি চালিত অটোরিকশাচালক রিপন বলেন, ‘এই কাঠের সাকো দিয়ে চলাচল করা ঝুকিপূর্ণ। যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কাঠের সাকোটি অনেক আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। ফলে মাঝে মাঝেই বিভিন্ন স্থানে ভেঙে যায়- স্থানীয়রা টাকা তুলে এই সাকোটি মেরামত করে থাকে। মেরামত করতে করতে সাকোটি এখন আর মেরামতেরও সুযোগ নেই।’
ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার অপর চালক আজমত আলী বলেন, ‘বৃজ করে দেবে বলে অনেকেই কথা দেয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই বৃজটি কেউ করে দেয়নি। আমাদের কাঠের সাকো দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। এই সাকোতে আমি একবার দুর্ঘটনার শিকার হই। তক্তা ভেঙে আমার গাড়ি নিচে পড়ে যায়। পরে ৬ জনে মিলে টেনে উপরে তুলি। কাঠের সাকো দিয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত ঝুকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। আমাদের এখানে বৃজ হওয়া অতি প্রয়োজন।’ 
স্থানীয় বাসিন্দা রাজু আহমেদ, কামাল হোসেন, ইসমাইল সিকদার, জয়নুদ্দিন সহ অনেকেই জানান, এই যে কাঠের সাকো তা খুবই ঝুকিপূর্ণ। আশপাশের প্রায় ২০ গ্রামের মানুষ এই সাকো দিয়ে চলাচল করে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে থাকে। জনপ্রতিনিধিরা বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও বৃজটি কেউ নির্মাণ করে দেয়নি। 
বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী(এলজিইডি) কাজী ফাত্তাউর রহমান বলেন, ‘বাসাইলের খাটরা বৃজটি অনূর্ধ্ব একশ’ প্রকল্পের প্রথম দিকের সিরিয়ালে রাখা হয়েছে। অনূর্ধ্ব একশ’ প্রকল্প শুরু হওয়ার মাত্রাই ব্রিজের টেন্ডার আহ্বান করা হবে।’
টাঙ্গাইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান লাঙ্গুলিয়া নদীর খাটরা অংশে বৃজ নির্মাণের বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন। এই বৃজটি অনূর্ধ্ব একশ’ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া আছে। ওই প্রকল্প শুরু করতে যদি সময় লাগে, তাহলে টাঙ্গাইলের অন্য প্রকল্প থেকে বৃজটি নির্মাণ করার ব্যবস্থা করা হবে।