আমি অবিনাশ। পেশায় একজন চিত্রশিল্পী।
এক সময় রঙের ভেতরেই আমার জীবন ছিল, ক্যানভাসে রঙের প্রতিটি আঁচড়ে ছিল আমার স্বপ্ন, ভালোবাসা আর বেঁচে থাকার অর্থ। অথচ আজ রঙের কাছেই আমি পরাজিত।
আমার স্ত্রী সাগরিকা চলে গেছে দুই বছর হলো। মৃত্যুর কাছে হেরে গিয়ে সে আমাকে রেখে গেছে একা করে ।আমাদের ভালোবাসার তিনটি সন্তান আর অসীম শূন্যতায় ঘেরা এক দীর্ঘ জীবন দিয়ে গেছে।
আমি মধ্য বয়স পেরিয়ে প্রৌঢ়ত্বের দোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। এই বয়সে বিপত্নীক হয়ে যাওয়া মানুষদের দুঃখ ভাষায় বোঝানো যায় না। যারা ভোগ করেনি, তারা তার গভীরতা কল্পনাও করতে পারবে না।
সাগরিকা আমার থেকে বয়সে অনেক ছোট ছিল। কত তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে ঝগড়া করেছি, অভিমান করেছি, অভিযোগ করেছি। তখন বুঝিনি, অভিযোগ করার জন্যও একজন আপন মানুষের প্রয়োজন হয়। আজ অভিযোগ করার কেউ নেই, অভিমান ভাঙানোর কেউ নেই, ঝগড়া করারও কেউ নেই। চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু পাশে কেউ নেই।
সাগরিকা চলে যাওয়ার পরে মনে হয় আমি যেন অথৈ সমুদ্রে ভাসমান এক নৌকা। চারদিকে শুধু জল আর জল, কোথাও কোনো তীর দেখা যায় না। এই বয়সে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে আর মন চায় না। আবার সংসারের অবিরাম শ্রম, দায়িত্ব আর একাকীত্বের ভারও বহন করা কঠিন ।
মানসিক দ্বন্দ্ব আর শারীরিক ক্লান্তি মিলে কখনো কখনো নিজেকে অসহায় মনে হয়।
অনেক সময় জীবনটাকেই ভারী লাগে। মনে হয়, আর কতদূর? আর কতটা পথ?
তবুও জীবন তো থেমে থাকে না। নিজের ইচ্ছায় না হলেও , বাধ্য হয়েই তাকে বয়ে নিয়ে যেতে হয়।
এই বিষণ্ণ সময়ে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে আপন মানুষদের। হঠাৎ মনে হয়, যদি আবার মায়ের কোলে মাথা রাখতে পারতাম! যদি তার স্নেহমাখা হাতটা কপালে এসে ছুঁয়ে যেত! যদি আরেকবার বাবার শাসন শুনতে পেতাম!
মাঝে মাঝে মন ছুটে যায় সেই শৈশবে, যেখানে দুঃখ ছিল ছোট, আর সাহস ছিল অনেক বড়।
আজ কোনো শাসন নেই, কোনো লাগাম নেই। জীবন যেন নিজের ইচ্ছে মতো ছুটতে চায়, আবার নিজেই নিজের ভারে থেমে যায়।
কখনো কখনো নিজের সন্তানদের দিকে তাকাতে ভয় লাগে। যে সন্তানদের একসময় আমি আর সাগরিকা আমাদের স্বপ্ন, আশা আর ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি বলে ভাবতাম, আজ তাদের ভবিষ্যৎ আমার কাছে এক বিশাল দায়িত্বের পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে হয়, আমি পারব না। সত্যিই পারব না।
সাগরিকার কথা মনে পড়লে চোখের কোণ ভিজে যায়। অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়ে।
অনেক দিন হলো হাতে রংতুলি, তুলি না। ক্যানভাস এখনো আছে, রংও আছে, কিন্তু রংগুলোর ভেতর আর কোনো রং খুঁজে পাই না।
তারা যেন আমার মতোই বিবর্ণ হয়ে গেছে।
এক সময় যে হাত রঙিন পৃথিবী সৃষ্টি করত, আজ সে হাত শূন্যতাও আঁকতে পারে না।
পথে হাঁটতে বের হলে মনে হয় পথও আমাকে চিনতে পারে না। পরিচিত রাস্তা গুলোও কেমন অচেনা হয়ে গেছে।
জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে ছন্দহীন পথচলা বড় কষ্টের।
এমন এক বেদনা, যার গভীরতা কাউকে বোঝানো যায় না।
মানুষের জীবনে অবসর আসা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সব থেকে ভয়ঙ্কর হলো, মানুষ বেঁচে থাকতে তার মনের মৃত্যু হয়ে যাওয়া।
শরীর তখনো হাঁটে, কথা বলে, শ্বাস নেয়, অথচ ভেতরের মানুষটা নিভে যায়।
আজ আমি সেই নিভে যাওয়া আলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমি ক্লান্ত। আমি পথহারা। আমি গন্তব্যহীন এক মানুষ।
হয়তো এখনো কোথাও এক বিন্দু আলো রয়ে গেছে। সেই আলোই আমাকে প্রতিদিন বলে, “আরেকটা দিন বেঁচে থাকো, হয়তো কোনো একদিন আবার রং ফিরে আসবে জীবনে,ভিন্ন পথে,ভিন্ন ভাবে”।