ভিকারুননিসায় সিআইডির সাইবার সচেতনতা কর্মসূচি

  • জসীম উদ্দিন খান
  • ২০২৬-০৬-১১ ২০:৫১:০৪
image

সকাল শুরু হয় একটি নোটিফিকেশন দিয়ে, ক্লাসের ফাঁকে চলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ বুলানো, অবসরে অনলাইন গেমিং আর সন্ধ্যায় ডিজিটাল লেনদেন। আজকের শিক্ষার্থীদের জীবনের বড় একটি অংশই আবর্তিত হচ্ছে পর্দার ভেতরের পৃথিবীকে ঘিরে। কিন্তু এই সুবিধার জগতের পাশাপাশি নীরবে বিস্তার লাভ করছে সাইবার প্রতারণা, পরিচয় চুরি, অনলাইন হয়রানি ও তথ্য ফাঁসের মতো ঝুঁকি।
প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন হওয়াও এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।একটি ওটিপি, একটি ভুল ক্লিক কিংবা একটি যাচাইবিহীন শেয়ার মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে একজন শিক্ষার্থীর জীবনের আগাম হিসেব নিকেশ। প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে সাইবার নিরাপত্তা আর কেবল প্রযুক্তিবিদদের বিষয় নয়; এটি এখন প্রতিটি নাগরিকের ভাববার বিষয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের দৈনন্দিন অন্যান্য সচেতনতারও অবিচ্ছেদ্য অংশ। 
এই সচেতনতার উপলব্ধি থেকেই আজ ১১/০৬/২০২৬ খ্রি. বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) এবং বিকাশ লিমিটেডের সহযোগিতায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে অনুষ্ঠিত হয় “Cyber Awareness Enhancement Program”। এতে অংশ নেয়  প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শ্রেণীর ৬০০ জন শিক্ষার্থী। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জনাব মাজেদা বেগমের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি), সিআইডি-এর ডিআইজি জনাব সানা শামিনুর রহমান। আরও উপস্থিত ছিলেন সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসির) বিশেষ পুলিশ সুপার জনাব মীর আবু তৌহিদ, বিপিএম (বার),বিকাশ এর ইভিপি ও হেড অব এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স জনাব এ কে এম মনিরুল করিম।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি), সিআইডি-এর ডিআইজি জনাব সানা শামিনুর রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্ম একই সঙ্গে বাস্তব ও ডিজিটাল; এই দুই জগতেই বসবাস করছে। প্রযুক্তির বিস্তার যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে নতুন ধরনের ঝুঁকি ও অপরাধের ক্ষেত্র। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি এর নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কেও সমানভাবে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
ডিআইজি সানা শামিনুর রহমান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, ওটিপি ও পিন নম্বর গোপন রাখা, অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, সাইবার অপরাধীরা মানুষের অসতর্কতাকেই সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে। সচেতনতাই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অপতথ্য ও গুজব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো তথ্য যাচাই না করে শেয়ার করা যেমন ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ হতে পারে, তেমনি সমাজেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রতিটি ডিজিটাল নাগরিকের দায়িত্ব তথ্যের সত্যতা যাচাই করে দায়িত্বশীল আচরণ করা।
অনলাইন বুলিং, সাইবার হয়রানি এবং ডিজিটাল অসদাচরণ প্রসঙ্গে তিনি শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে বলেন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার যেমন ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, তেমনি এর অপব্যবহার অন্যের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও আহ্বান জানান, তারা যেন নিজেদের পরিবার, বন্ধু এবং সমাজে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতার দূত হিসেবে কাজ করে। তিনি আশ্বস্ত করেন, সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল বা হয়রানির শিকার হলে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার সর্বদা সহায়তার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম তার বক্তব্যে সিআইডির এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রমের জন্য প্রথমেই ধন্যবাদ জানান। এ সচেতনতা কার্যক্রম থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদেরসহ পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদেরকেও সুরক্ষিত করার প্রয়াস রাখবে।
প্রধান বক্তা অতিরিক্ত ডিআইজি জনাব মো. জাহিদুল ইসলাম, বিপিএম-সেবা বলেন, বর্তমান প্রজন্মের বড় একটি অংশের শিক্ষা, যোগাযোগ, বিনোদন এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সাইবার নিরাপত্তা এখন আর শুধু প্রযুক্তিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি প্রতিটি শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং নাগরিকের জন্য অপরিহার্য জীবনদক্ষতায় পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি প্রযুক্তির ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণ গড়ে তোলাই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সাইবার অপরাধীরা সাধারণত প্রযুক্তির দুর্বলতার চেয়ে মানুষের অসতর্কতাকেই বেশি কাজে লাগায়। একটি ওটিপি শেয়ার করা, অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা একজন মানুষকে বড় ধরনের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। তাই সচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাসই সাইবার নিরাপত্তার প্রথম ও সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমি শিক্ষার্থীদের শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হিসেবে নয়, বরং নিরাপদ ডিজিটাল সমাজ গঠনের অগ্রদূত হিসেবে দেখতে চাই। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নীতিনির্ধারক, গবেষক, উদ্যোক্তা ও নেতৃত্ব। তাই তাদের মধ্যে সাইবার সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা এবং ডিজিটাল নাগরিকত্বের মূল্যবোধ গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন সচেতন শিক্ষার্থী শুধু নিজেকে নয়, তার পরিবার, বন্ধু এবং পুরো সমাজকে সাইবার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্মানিত অতিথি বিশেষ পুলিশ সুপার জনাব মীর আবু তৌহিদ, বিপিএম (বার) বলেন, আজকে যারা শিক্ষার্থী আছে তাদের মধ্যে থেকেই আগামীর সম্ভাবনাময় ব্যক্তিত্বগুলো বেরিয়ে আসবে। কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসা, সরকারি চাকুরে কিংবা রাজনীতিবিদদের মতো নেতৃত্বে যারা থাকবে তারা প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন থাকার পাশপাশি নিজেরাও অন্যদেরকে সচেতন করবে। তারা কখনোই এসব ডিজিটাল প্রতারণা কিংবা ব্ল্যাকমেইলিং এর শিকার হবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।  
সম্মানিত অতিথি জনাব এ কে এম মনিরুল করিম, ইভিপি ও হেড অব এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স, বিকাশ লিমিটেড বলেন, বিকাশের মাধ্যমে যেমন আমাদের জীবন যাত্রা সহজ হয়েছে তেমনি এক শ্রেণীর প্রতারকের কারণে অনলাইনের এ প্ল্যাটফর্মটি আতঙ্কিত। তবে সচেতনতার কারণে এখন প্রতারকরা আর আগেরমতো মানুষকে বোকা বানাতে পারে না। এই তরূণ প্রজন্ম এসব ধোঁকাবাজি সহজেই বুঝতে পেরে যায় বলে প্রতারণার হার অনেক কমে এসেছে। বক্তব্যকালীন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সম্পর্কিত ধোঁকাবাজির কয়েকটি দৃশ্যচিত্র প্রদর্শন করেন। 
অনুষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাইবার পুলিশ সেন্টারের কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিকাশ লিমিটেডের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। বক্তারা বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অন্যতম পূর্বশর্ত।
আজকের একজন শিক্ষার্থীর হাতে বইয়ের পাশাপাশি রয়েছে একটি স্মার্টফোন। সেই ফোনে আছে পাঠ্যসামগ্রী, বন্ধুত্ব, বিনোদন, ব্যাংকিং সেবা এবং পুরো পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগের সুযোগ। কিন্তু একই সঙ্গে সেখানে ওত পেতে থাকে ফিশিং লিংক, ভুয়া অফার, সাইবার বুলিং, পরিচয় চুরি এবং অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকিও। ডিজিটাল এই বাস্তবতায় সচেতনতাই হয়ে উঠবে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।
“Think Twice Before You Click; Cyber Knowledge is Your Best Firewall”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত কর্মসূচিটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও সচেতন ডিজিটাল আচরণ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন।