ফা রু ক এ ম জা হা ঙ্গী র

  • জন্মদিন ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা
  • ২০২৩-০৯-১৫ ২০:১৭:১৮
image

আজ আমার জন্মদিন। পিছনে তাকিয়ে দেখি - মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে গেলো। শৈশব, কৈশোর কিংবা যৌবনে কখনো জন্মদিন পালন করা হয়নি। এ বেলায় ভার্চুয়াল লাইফে জন্মদিনটা এসে যায় ফেবুর অতীন্দ্রিয় তৎপরতায়। বন্ধু স্বজন প্রিয় অনুরাগীরা জেনে যায় কখন কার জন্মদিন। তাই তো গরিবের ঘোড়ারোগের মতই আমার এই জন্মদিন আখ্যান। এ দিন নিয়ে আমার ভাবনা কি, তা নিয়ে কিছু কৌতূহল সঙ্গত কারণেই বন্ধুদের থাকে। তাই নিয়ে প্রতিবারের মতো এবারও আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।
শৈশব কৈশোরে যখন বুদ্ধির বিকাশ হচ্ছিলো তখন থেকেই নিজেকে একজন সৎ দেশ প্রেমিক উত্তম আদর্শবান মানুষ রূপে গড়ার প্রত্যাশা নিয়েই আগামীর সোপানে পা বাড়িয়েছি। শোষিত বঞ্চিত মানুষের সহায় হবো, দুখী মানুষের পাশে দাঁড়াবো, শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধ জারী রেখে মানুষের দুঃখ কষ্ট ঘুচাবো - এই ছিলো জীবনের পরম ব্রত। 
নিজেকে যোগ্য মানুষ রুপে তৈরী করে জননী জন্মভুমিকে গৌরবান্বিত করবো। পরিবার সমাজ আর দেশে ইতিবাচক পরিবর্তনের অগ্রনায়ক হবো- এই ছিলো আশা । শৈশব কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের মধ্যাহ্ন অতিক্রম করছি আজ। কালের ধারায় হারিয়ে গেছে আমার লালিত স্বপ্ন, স্বাদ সবই। আর অর্জন? বলার মত তেমন কিছুই অর্জন করতে পারিনি আমি। অংকের হিসেবে আমি ফেল মেরেছি প্রায়।
তদুপরি জীবনে একজন ভালো মানুষ হতে ছেয়েছিলাম। তাও পারিনি বোধ হয়। এ আমার ব্যর্থতার সীমাহীন গ্লানি আর অপূর্ণতা । মানুষের সব চাওয়া পুরন হয় না, আমারও হয়নি। জীবন ও মৃত্যুর মাঝে নিকষ কালো অন্ধকারের পর্দা রয়েছে মনে হয়। আর সেটাই একদিন ঢেকে দিবে জীবনের যত আলো, যত আশা। এটাই একমাত্র সত্য। বাকি সব মিথ্যা, ভঙ্গুর এবং ক্ষণস্থায়ী ।
এই সুন্দর পৃথিবীতে আরও কিছুটা সময় বেঁচে থাকতে চাই, জানি না কতটা সময় বরাদ্দ রেখেছেন আমার পরওয়ারদিগার! বন্ধুদের কাছে দোয়া চাইছি, চাইছি ভালোবাসা ও সুমহান ক্ষমা। বিশ্ব জাহানের প্রতিপালকের কাছে চাইছি তাঁর অপার করুণা ।
আমার জন্মদিনে অনেক অনেক বন্ধু শুভানুধ্যায়ী শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। তাঁদের সবাইকে অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা আর অফুরান ভালোবাসা জানাচ্ছি। আমি একদিন থাকবো না। কিন্তু আমার ভালোবাসার অনন্ত ধারা বইবে চিরকাল সব মানুষের জন্য, এই ধরিত্রী মায়ের জন্যও।
আমার জন্মদিনে আমার স্বশিক্ষিত মা আমার জন্মের পরে অন্য অনেক মায়ের মত সাদা কাপড়ে সুঁই দিয়ে রঙিন সুতোয় লিখে আয়নায় বেঁধে ঘরের দেয়ালে রেখে দিয়েছিলেন-আমার প্রতি তাঁর আকাঙ্ক্ষা । আমার জন্য তাঁর এই বাণী চিরন্তনীঃ
“প্রথম যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে,
তুমি মাত্র কেঁদে ছিলে, হেঁসে ছিলো সবে।
এমন জীবন তুমি করিও গঠন,
মরনে হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভূবন ।"
মাকে খুব মনে পড়ছে, বাবাকেও। তাঁদের প্রত্যাশা কি পূরণ করতে পেরেছি? নিশ্চিত পারিনি আমি। শেষ বিদায়ে এই ভুবন কাঁদবে এমন কিছু কি অর্জন করতে পেরেছি আমি? পারিনি তা আমি নিঃসন্দেহে। ক্ষমা করো মা-বাবা তোমাদের অযোগ্য সন্তানেরে তার অক্ষমতার জন্য। এই লিখাটা লিখার সময় কেবলই আমিই কাঁদছি, দু চোখে অশ্রুর বন্যা।
সময়ের কথা ও ব্যথা-
ছোট বেলা থেকেই টুকটাক লেখালেখির অভ্যাস, বিশেষ করে কবিতা। পত্র পত্রিকায় বা বই আকারে প্রকাশের মতো সে সব ছিলো না হয়তো। অদম্য মনোবল আর ভালোবাসার জোরেই লিখে গিয়েছি জীবনের এলোমেলো ভাবনাগুলো। ফেসবুক এলো, প্রথমে ইংরেজি বর্ণমালায় বাংলা কবিতা লিখেছি ফেবুতে। পরে অভ্র রীতি এসেই পাল্টে দিলো আমাদের লিখার দিগন্ত।
শুরু করলাম প্রবন্ধ, কবিতা এমন সব মনের এলোমেলো ভাবনা। বানানে বেশ ভুল হতো, কেয়ারলেস ছিলাম অনেকটা। তবুও ধীরে ধীরে অনুরাগীদের সংখ্যা বাড়তে লাগলো, একই সঙ্গে সমালোচনাও। বস্তুত সমালোচকদের কারণেই বানান রীতিতে ভুলের পরিমাণটা কমে আসতে লাগলো। অনেকে আমায় কবি বলে সম্বোধন করতে শুরু করলেন। প্রথম প্রথম লজ্জা পেলেও অন্তরালে উপভোগ করতাম এ মধুর সম্বোধনটুকু।এ যেন আমার আত্মবিশ্বাসের টনিক। এখনও বানানে শতভাগ নির্ভুল নই আমি, বেখেয়ালে আজও ভুল হয়ে যায়, কেউ ধরিয়ে দিলে লজ্জা পেলেও ধন্যবাদই দেই মন থেকে। কারণ তাঁরাই আমার নির্ভুল থাকার প্রাণশক্তি।
আমি আত্মপ্রচার বা শুধু লিখার জন্য লিখিনি। যা কিছু লিখেছি কিংবা লিখছি তা একটা সুনির্দিষ্ট মিশন এবং ভিশন থেকেই। অর্থাৎ একটা উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়েই লিখেছি। আর তা হলো একজন মানুষ হিসাবে দেশ, জাতি ও কালের উর্ধ্বে উঠে মানব জনমের স্বার্থকতা তুলে ধরা। আমার দেশমাতৃকাকে গর্বিত করা, স্বজাতির সমৃদ্ধ অতীতকে মাটি খুঁড়ে বের করে আনা, আমার ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিস্বত্বার সম্মান প্রতিষ্ঠার অবিরাম প্রয়াস। আমি সযত্নে সেই চেষ্টা করে এসেছি আমার মন ও মননের সকল ক্ষমতা দিয়ে। আমাদের এই গর্বিত মানচিত্র, আমার কাছে আমার জননী জন্মভূমি থেকে প্রিয়তম কিছুই এই ভ্রম্মান্ডে নেই।
একটা সময়ে এসে গ্রুপ সাহিত্যের সাথেও আমার পরিচয় এবং লেখালেখি। এ সময়ের অভিজ্ঞতা অম্ল মধুর। যাই হোক, সময়ের প্রয়োজনে বন্ধু সুহৃদদের প্রেরণায় সৃষ্টি করলাম নব দিগন্তে বাংলা সাহিত্যের সূর্যোদয় "বাংলা কবিতাঙ্গন" সাহিত্যগ্রুপ। একঝাঁক প্রজ্ঞাবান কবি সাহিত্যিকগণের সুললিত পদচারণে ভালোই আছে সাহিত্যের এই প্লাটফর্মটি। নির্মোহভাবে পরিচালনার প্রাণান্ত চেষ্টা থাকে মানবীয় সীমাবদ্ধতার মাঝেও।
ইতোমধ্যে ২০১৯ সালের জাতীয় গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় আমার প্রথম একক কাব্যগ্রন্থ "নীল সমুদ্দুর" এবং দ্বিতীয় একক কাব্য্যগ্রন্থ "ফেরারী বসন্ত"। একজন নবীন কবির কবিতার বই যতটা চলার সে রকমই চললো, মোটামুটি। তবে খরচ উঠে আসেনি, বুঝলাম- সেটা আসেও না। তবে আর্থিকভাবে অতটা সচ্ছল না হওয়ায় আমার জন্য কিছুটা কষ্টকর ছিলো খরচটা বহন করা। এ জন্য আমার অন্য বাজেট থেকে কাটছাট করতে হয়েছিলো। গত ২০২০ এর জাতীয় বই মেলায় এলো একক কাব্যগ্রন্থ "জলনূপুর"। বিক্রি আহামরি কিছু নয়, চলেছে বেশ। এটুকুই বলা যায়।
কাল মহাকালঃ ভারতীয় উপমহাদেশে মানব সভ্যতার উৎপত্তি ও বিকাশ, এতদাঞ্চলের মানুষের সাতহাজার বছরের পথ পরিক্রমায় তাদের জীবন দর্শন, ধর্ম দর্শন এবং রাজনৈতিক পরিক্রমার ইতিহাস গবেষণামূলক প্রবন্ধগন্থ "কাল মহাকাল" লিখা সমাপ্ত করে ছাপাতে দিলেও চলমান বাস্তবতায় বড় ধরণের এডিট করতে যেয়ে শেষ পর্যন্ত বইটি আর ২০২০ এর বই মেলায় আলোর মুখ দেখেনি।পরিবর্তিত সুচীতে ইচ্ছা ছিলো ২৬ মার্চ, ২০২০ এর স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে একটি প্রকাশনা উৎসবের মাধ্যমে  "কাল মহাকাল' এর মোড়ক উন্মোচন করাবো৷ কিন্তু চলমান বৈশ্বিক ও জাতীয় মহামারী-দুর্যোগের বাস্তবতায় তা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। শেষ পর্যন্ত বইট প্রকাশনা সংস্থা "গলুই প্রকাশন"এর ব্যানারে ২০২২ অমর একুশে জাতীয় বই মেলায় বইটি আলোর মুখ দেখে। 
আমার অনেক স্বপ্ন ছিলো কাল মহাকাল নামের এই প্রবন্ধ গ্রন্থটি নিয়ে, অনেক আশাবাদ এর তাৎপর্যময় ব্যাপ্তি নিয়ে। কিন্তু অতোটা সাফল্য পায়নি এই প্রবন্ধ গ্রন্থটি। এ নিয়ে প্রচণ্ড হতাশা রয়েছে আমার ভেতর।  ২০২২ এ আমার আরও একটা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়- আরণ্যক নদী ও মাতাল হাওয়া এবং সর্বশেষ ২০২৩ এ ঢাকার প্রিয়জন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয় আমার ' হিমাদ্রি কথা ' কাব্যগ্রন্থটি।
জন্মদিনের এই ক্ষণে বদলে যাওয়া পৃথিবীর এই প্রান্তে বসে বিবেকের তাড়নায় বলে গেলাম নিজের বোধের কথাগুলো। এ সব কথা বলার সুযোগ আর নাও পেতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন, তাঁর করুণাসিক্ত সুস্থ সুন্দর কল্যাণকর এক মানবিক পৃথিবী দান করুন।
যে সকল সম্মানিত অনুরাগী বন্ধু স্বজন জন্মদিনে আমায় শুভেচ্ছা জানিয়ে নানা আয়োজন করেছেন, তাঁদের প্রতি অন্তরের অন্তস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। একটা সময় ব্যর্থ মনে হতো আমার এ মানব জনম। যখন এতো এতো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হই, তখন মনে হয়- জনম ব্যর্থ নয়। ভালোবাসার ফুল আর পাখিদের এমন উচ্ছ্বাস কয়জনেই বা আর পায়।
ভালোবাসি বন্ধু তোমাদের, 
ভালো থেকো তোমরাও, 
জীবন হোক ভালোবাসাময়
জীবন ছড়িয়ে দিক আলো আরও আলো। 
আমীন, ছুম্মাহ আমীন।