পাইকগাছা (খুলনা):
ভূমি অধিগ্রহনে সওজের বেঁধে দেওয়া দোকান মালিকের ক্ষতিপূরণের নির্দ্ধারিত টাকার রেট পূণর্বিবেচনার আবেদন পূণর্মূল্যায়নসহ অধিগ্রহনের টাকা না দিয়েই দোকান-পাঠ, বসতবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)।
শনিবার সড়কের পাইকগাছা অংশের কপিলমুনির ফকিরবাসা মোড় ও সোমবার গোলাবাটি মোড়ের স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করেন তারা। এসময় কপিলমুনির স্থাপনা মালিকরা জেলা প্রশাসক বরাবর করা পূণর্মূল্যায়নের আবেদনপত্রের উত্তরের জন্য সময় চাইলেও তাদের কোন কথার কর্ণপাত না করেই এদিন অন্তত ১০টি দোকান ও প্রয়াত সাংবাদিক শেখ মোসলেহ উদ্দিন বাদশাহ’র সূরম্য দ্বিতল বসতবাড়িটি স্কেভেটর দিয়ে গুড়িয়ে উচ্ছেদ করা হয়।
এর আগে প্রকল্পের ৩৪ টির অন্তত ১০ টি পয়েন্টে অধিগ্রহনের টাকা না পাওয়ায় কাজ বন্ধ করে দেয় সেখানকার জমি মালিকরা।
এ প্রসঙ্গে সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক বলেন, অধিগ্রহণের জমির টাকার চেক প্রস্তুত রয়েছে, জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষর না হওয়ায় তা প্রদান করা যাচ্ছেনা। অতিদ্রুত অধিগ্রহনের টাকা পরিশোধ সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হবে বলেও জানান সড়কের এ জেষ্ট্য কর্মকর্তা।
জানাগেছে, খুলনার বেতগ্রাম হতে কয়রা ভায়া পাইকগাছা আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ণ ও বাঁক সরলীকরণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২০ সালে। যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালে। প্রকল্পে সড়কের ৩৪টি বাঁক সরলী করণে জমি অধিগ্রহণ ও রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য ৩'শ ৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। শুরু থেকে প্রকল্পে নানা অসংগতির পাশাপাশি সরলীকরণ সংক্রান্তে নানা জটিলতা ভর করে আছে। এখন পর্যন্ত মাত্র অর্ধশত জমি মালিককে ক্ষতিপূরণের টাকা বুঝে দেওয়া হলেও প্রায় সিংহভাগ জমি মালিক অধিগ্রহনে তাদের প্রাপ্য টাকা বুঝে পায়নি।
সওজ সূত্র জানায়, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে খুলনার কয়রা-বেতগ্রাম আঞ্চলিক সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের জুনে। শুরুতে প্রকল্পে বরাদ্দ হয় ৩৩৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর অন্তত চার বার কাজের মেয়াদ বৃদ্ধির পাশপাশি ৫০ কোটি টাকার ব্যায়বরাদ্দ বাড়ানো হয়। তবে গত আওয়ামী লীগ সরকারের শাষনামলে ভূমি অধিগ্রহণ সহ নানা জটিলতায় হত ৬ বছরেও শেষ হয়নি সড়কের কাজ। সর্বশেষ বর্ধিত মেয়াদ অনুযায়ী চলতি বছরের ৩০ জুন কাজ শেষ হওয়ার কথা। যদিও সর্বশেষ অবস্থাদৃষ্টে জুনের মধ্যে কাজ শেষ হবে কিনা তা নিয়ে রীতিমত আশংকা তৈরি হয়েছে।
প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কয়রা-বেতগ্রাম সড়ক উন্নয়নে ২০১৯ সালের একনেক সভায় অনুমোদন পায় প্রকল্পটি। ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোজাহার এন্টারপ্রাইজ। প্রথম দফায় ২০২২ সালের ৩০ জুন কাজ শেষ করার কথা। তবে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৪ দফায় সময় বাড়ানো হয়। এরপর ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর কাজ ফেলে লাপাত্তা হয়ে যায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লোকজন। দীর্ঘ দিন কাজে না ফেরায় কালো তালিকাভুক্ত করা হয় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটিকে। এরপর আগ্রহ দেখিয়ে কাজে ফেরায় ফের অনুমতি দেয় সওজ।
এদিকে অধিগ্রহনের টাকা না পাওয়ায় উপজেলার কার্তিকের মোড় এলাকায় চলমান কাজের দু'পাশে বাঁশের বেড়ার সাথে লাল কাপড় ঝুলিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয় সেখানকার ভূক্তভোগী জমি মালিকরা।
একইভাবে কাজ বন্ধ থাকে উপজেলার কপিলমুনি, গোলাবাটি, গোপালপুর, গজালিয়ার ৩ টি, মৌখালী, কয়রা উপজেলার কয়রা মদিনাবাদসহ অন্তত ১০ টি স্পটে।
এমন পরিস্থিতিতে সর্বশেষ গত ৬ জুন সওজের খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী টানিমুল হকের নেতৃত্বে সওজ ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কপিলমুনি সদরের ফকিরবাসা মোড়ের ১০টি দোকানসহ একটি বহুতল ভবন ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়। এসময় বাড়ির লোকজন তাদের ব্যবহার্য নিত্য প্রয়োজনীয় মালামাল পর্যন্ত ঘর থেকে বের করতে পারেনি।
এপ্রসঙ্গে সেখানে উপস্থিত বাড়ির মালিকদের একজন শেখ জহির উদ্দীন বাবর বলেন, তাদেরকে ক্ষতিপূরণের টাকা না দিয়েই হটকারী ভাবে তাদের কারো কথার কর্ণপাত না করেই জোরপূর্বক তাদের দোকান-পাট ও বসতবাড়ি গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এসময় ক্ষতিগ্রস্ত অপর দোকান মালিক এ্যাড. দীপঙ্কও কুমার সাহা বলেন, তাদের ৪ তলা ফাউন্ডেশনের ০.০১১০ একর জমির উপর একতলা বিশিষ্ট দোকান ঘরের মূল্য নির্দ্ধারণ করা হয়েছে বাস্তু শ্রেণিতে। এছাড়া ভবনটি পাশের ভাঙ্গা টালীর ঘরের সমান ভ্যালুয়েশনে ধরা হয়েছে। চিঠি পাওয়ার পর জেলা প্রশাসক বরাবর পূণর্বিবেচনার জন্য আবেদন করেন তারা। এরপর স্থানীয় পর্যায়ে গণশুনানী ও জেলা প্রশাসক তাদেরকে পূণর্বিবেচনার জন্য আশ্বস্ত করলেও সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগেই হটকারীভাবে অন্যদের সাথে তার দোকান ঘরটিও ভেঙ্গে গুড়য়ে দেওয়া হয়।
এব্যাপারে সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুুল হক বলেন, ক্ষতিগ্রস্থদের অধিগ্রহনের টাকার চেক প্রস্তুত রয়েছে। ডিসি স্যার স্বাক্ষর করলেই তারা তা পেয়ে যাবেন।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) দিপংকর দাশের ব্যবহৃত মুঠো ফোনে কয়েক বার কল দিলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।