দুই গ্রামের সংঘর্ষে নিহত ১ আহত ৩০ টাঙ্গাইলে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে দফায় দফায় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ

  • আব্দুস সাত্তার,
  • ২০২৬-০৬-০৫ ২১:২৬:৩২
image

প্রতিনিধি টাঙ্গাইল:
টাঙ্গাইলের গোপালপুর ও ভূঞাপুর উপজেলার পাশাপাশি দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে বৃহস্পতিবার(৪ জুন) সন্ধ্যায় টানা চার ঘণ্টার সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রশাসন ওই এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে। প্রশাসনের জারি করা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে শুক্রবারও (৫ জুন) দফায় দফায় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ওই ঘটনায় ১ জন নিহত ও উভয় গ্রামের অন্তত  ৩০জন আহত হয়েছে। এ সময় ১৬টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, গরু-বাছুর, গোলার ধান ও গৃহস্থালী সামগ্রী লুটপাটেরও ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের নলিন বাজারে হামলা চালিয়ে শতাধিক দোকানপাট ভাংচুর ও লুট করা হয়। এতে পুরো এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, দোকানে বাকি খাওয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধের জেরে গত ২২ এপ্রিল গোপালপুর উপজেলার গুলিপেঁচা ও ভূঞাপুর উপজেলার জগৎপুরা গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সেই বিরোধের ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার বিকালে দুই পক্ষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। টানা চার ঘণ্টার সংঘর্ষে একজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। এ সময় অন্তত ১১টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে প্রশাসন সংশ্লিষ্ট এলাকায় দ-বিধির ১৪৪ ধারা জারি করে।
এদিকে, শুক্রবার সকালে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে আবারও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় অন্তত পাঁচটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়। এতে এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা জানান, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। সংঘর্ষ আশপাশের এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
স্থানীয় একাধিক সূত্র নিশ্চিত করে জানায়, বৃহস্পতিবার থেকে গোপালপুর ও ভূঞাপুর উপজেলার দুই গ্রামের লোকজনের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলছে। এতে একজন নিহত ও অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছে। গোপালপুর অংশে বৃহস্পতিবার রাতে মাইকিং করে অস্ত্র নিয়ে সমবেত হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে গোপালপুরের নলীন ও ভূঞাপুরের জগৎপুরা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে স্থানীয় প্রশাসন। এর মধ্যেই শুক্রবার সকালে দুই এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটে। জগৎপুরার কয়েকটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। 
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, প্রথমে দুই গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন সংঘর্ষের প্রভাব অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গোপালপুর অংশের লোকজন বৃহস্পতিবার রাতে মাইকিং করে ‘শুক্রবার যার কাছে যে অস্ত্র আছে, তা নিয়ে নলিন বাজারে উপস্থিত হওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়’। এর জেরে রাতেই ১৪৪ ধারা জারি করে স্থানীয় প্রশাসন। শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে এই আদেশ কার্যকর থাকবে আর বলবৎ থাকবে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত। 
গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শামছুল আলম জানান, মাস খানেক আগে গোপালপুর উপজেলার গুলিপেচা এবং ভূঞাপুর উপজেলার অর্জুনা ইউনিয়নের জগৎপুরা গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে দোকানে বাকি চাওয়াকে কেন্দ্র করে ওই দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে সংঘর্ষে ২৮-৩০জন আহত হয়। এতে অর্জুনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নিয়ামত আলী খান আহত হন। পরে জগৎপুরাবাসিরা গুলিপেচা গ্রামে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। এর প্রতিশোধ হিসাবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর জগৎপুরা গ্রামের কয়েকশ’ মানুষ লাঠিসোটা ও রামদা নিয়ে গুলিপেচা গ্রামে হামলা চালায়। তারা ১১টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে।  গরু-বাছুরসহ সব কিছু লুট করে নিয়ে যায়। হামলায় নারী শিশুসহ অনেকেই আহত হয়। এর মধ্যে হেমনগর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের অবস্থা গুরুতর।
অপরদিকে জগৎপুরা গ্রামের বাসিন্দা এবং নলিন বাজারের ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, এদিন রাত ৮টার পর হেমনগর ইউনিয়নের শাখারিয়া গ্রামের কয়েকশ’ মানুষ নলিন বাজারে হামলা চালায়। তারা বেছে বেছে জগৎপুরা গ্রামের ব্যবসায়ীদের দোকানপাট ভাংচুর ও লুট করে। এতে প্রায় তিন কোটি টাকার পণ্য লুট হয়। এদিন গভীর রাত পর্যন্ত উভয় পক্ষ রণপ্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে হামলার জন্য অপেক্ষা করছে এমন অভিযোগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। 
দুই গ্রামের সংঘর্ষে ভূঞাপুরের অর্জুনা ইউনিয়নের জগৎপুরা গ্রামের হাবিবুর রহমান তালুকদারের ছেলে কালাম তালুকদার(৬৫) নিহত হয়েছেন। ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. লুৎফর রহমান আজাদ নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, হাসপাতালে পৌঁছার আগেই কালাম তালুকদার মারা গেছেন। 
ভূঞাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলু জানান, দুই গ্রামের মধ্যে চলমান বিরোধটি মূলত একটি ব্যক্তিগত তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। কয়েক মাস আগে একটি দোকানে বাকির টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। পরে বিভিন্ন সময় বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। হঠাৎ আবারও সংঘাত শুরু হয়েছে।  
ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাহবুব হাসান জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন। সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এছাড়া তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মো. সামসুল আলম সরকার জানান, বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে গোপালপুরের নলীন বাজার, গুলিপেঁচা এবং ভূঞাপুর উপজেলার জগৎপুরা এলাকায় বিপুল পরিমান পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। দুই উপজেলায় এখন থমথমে পরিস্থিতি ও চাপা উত্তেজনা রয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে।