সু ব র্ণা রা য়

  • সোনালী বিকেল
  • ২০২৬-০৬-০৫ ০৯:৫৮:২৯
image

“কি ব্যাপার জলিল সাহেব? ভাবিকে দেখলাম হন্তদন্ত করে বেরিয়ে যেতে!”
জলিল সাহেব হেসে বললেন
“ব্যাংকের চাকরি তো ভাই… সকাল বেলায় লম্বা লম্বা সিগন্যাল পার হয়ে অফিস যেতে হয়। সময়টা বড় কথা।”
রূপালীকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন,যতক্ষণ না চোখের আড়াল হলো‌ রুপালি।
পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটে ইমাম হোসেন ছেলেকে স্কুলে দিয়ে ফিরছিলেন। জলিল সাহেবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু কথা বলে ভেতরে চলে গেলেন।
জলিল সাহেব ভালো বেতনের সরকারি চাকরি করেন। গাড়ি,বাড়ি, সুযোগ-সুবিধা—সবই আছে।
আজকাল সরকারি চাকরি মানেই এক রকম নিশ্চিন্ত জীবন। ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক, বেতন ঠিক সময়ে আসবেই।
সমস্যা হয় এই বেসরকারি চাকরিজীবী আর ছোট ব্যবসায়ীদের। তাদের অনিশ্চয়তার শেষ নেই। তবে এ নিয়ে কিছু বলার নেই—সব ব্যবস্থারই সুবিধা-অসুবিধা আছে।
রূপালীর চাকরি না করলেও সংসার চলত।
কিন্তু তার এক কথা,নিজের পরিচয় আছে—“আমি মানুষ, আমিও কাজ করব”—এই বিশ্বাস থেকেই চাকরি করে সে।
সে চেষ্টা করে সংসার আর অফিস—দুটোই সামলাতে। কিন্তু সবকিছু কি একা সামলানো যায়?
ভোরে উঠে রান্না, ঘর গোছানো—সব শেষে অফিস।
তারপর ফিরে এসে আবার সেই একই চক্র।
একজন সাহায্য কারী থাকলে একটু স্বস্তি পেত।
কিন্তু জলিল সাহেব কখনো সেই প্রয়োজনটা অনুভব করেন নি।তারমতে বাইরের মানুষ ঘরে ঢুকানোই উচিত নয়। নিজের কাজ নিজে করাতেই আত্মতৃপ্তি।
তার কাছে—সংসার চলছে, চাকরি চলছে,চলছে তো —তাহলেই যথেষ্ট।
জলিল সাহেব মানুষ হিসেবে ভালো, তবে একটু আরাম প্রিয়। সংসারের অনেক দায়ই অজান্তেই রূপালীর ওপর ছেড়ে দেন।
রূপালী সবকিছু হাসিমুখে মেনে নিলেও মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
আর সেই ক্লান্তি জমে গেলে ছোটখাটো কথাতেই অশান্তি শুরু হয়।
জলিল সাহেব সরাসরি ঝগড়া করেন না। কিন্তু কথার খোঁচায় আঘাত করতে পারেন খুব নিপুণভাবে।
“শিক্ষিত মানুষ হয়ে আচরণ এমন কেন?”—এই ধরনের কথায় রূপালীকে আরও বেশি কষ্ট দেন।
রূপালী গান ভালোবাসে, একসময় গাইতও। বই পড়া ছিল তার নেশা।
কিন্তু এখন এসব যেন “সময় নষ্ট” বলে মনে হয় জলিল সাহেবের কাছে।রুপালি ও আর আগের মত সময় পায় না।
তবুও রূপালী নিজের মতো করে বাঁচার চেষ্টা করে। বাইরে নিজের ইমেজ ঠিক রাখতে চায়, তাই সব সামলে চলে।
কখনো কখনো সে ভাবে,
তার সহকর্মী লিপির কথা।
লিপির বাসায় পার্মানেন্ট কাজের লোক, কোনো দুশ্চিন্তা নেই।কি আরামের জীবন লিপির।
আর আমাকে দেখো?
হলুদ-লবণের দাগে ভরা হাত।
রাত, প্রায় এগারোটা। রুপালি আর জলিল সাহেব বসে টিভি দেখছেন।হঠাৎ চিৎকার শুনে দু’জনেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
ইমাম সাহেবও দাঁড়িয়ে।
“কি হয়েছে ভাই?”
ইমাম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন
“পাশের ফ্ল্যাটে সমস্যা। স্বামী অফিসে গেলে বউ সারাদিন TikTok করে, ঘরের দিকে খেয়াল নেই। বাচ্চাদের খাওয়া-দাওয়া,পড়াশুনায় মন নেই।অনেকদিন ধরেই অশান্তি চলছিল। আজ শুনছি সংসার ভাঙার কথা চলছে…”দুজনেই ভ্রু কুঁচকে রুমে চলে এলেন।মনে মনে কি যেন ভাবলেন।
পরের দিন দুপুর বেলা ।অফিসে লাঞ্চ করতে বসেছেন জলিল সাহেব।
হঠাৎ রূপালীর ফোন,
“কি করছো? খেয়েছো?”
এই মিষ্টি স্বরে তিনি একটু অবাক হলেন। ভাবলেন রুপালির আবার কি হলো।
“শোনো, আজ একসাথে লাঞ্চ করি না?”
জলিল সাহেব থমকে গেলেন
“আমার অফিস উত্তরা, তোমার মতিঝিল… কীভাবে?”
রূপালী বলল
“আমি বনানীতে আছি। লিপির খুব মন খারাপ ছিল। ওর হাজবেন্ডের ব্যাপারে ঝামেলা হয়েছে। ওর হাজব্যান্ড কে অন্য নারীর সাথে দেখেছে।তাই অফিসে এসে কান্নাকাটি করছিল।ওকে বাসায় দিয়ে আসলাম।
ভাবলাম, আজ একটু একসাথে সময় কাটাই।”
জলিল সাহেব একটু চুপ থেকে বললেন
“ঠিক আছে, তুমি ওখানেই থাকো। আমি আরলি লিভ নিয়ে আসছি।”
গাড়িতে পাশাপাশি বসে আছে দু’জন।কেউ কিছু বলছে না কিন্তু মনের অজান্তেই একটা প্রশান্তি বয়ে যাচ্ছে।
দু’জনেই একই কথা ভাবছে।
রূপালী ভাবছে
“আমার এরকম গম্ভীর,অলস মানুষটাই ভালো।”
জলিল সাহেব ভাবছেন
“এই পোড়া ভাজা, আধসিদ্ধ তরকারিই আসলে আমার সবচেয়ে প্রিয়।”
অজানা এক শান্তি নিয়ে তারা বাসায় ফিরল।
নির্ভেজাল জিনিসে হয়তো ঝলক কম থাকে,
কিন্তু তৃপ্তিটা ভেজালের চেয়ে অনেক গুন বেশি।